প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
থাইল্যান্ডের সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী আবেগ ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক রাজনীতির জোয়ারে বড় সাফল্য পেয়েছে রক্ষণশীল ভুমজাইথাই পার্টি। সেনা সমর্থিত ও রাজতন্ত্রপন্থী এই দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল। প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের ৫০০ আসনের মধ্যে প্রায় ২০০টি আসনে জয় পেয়েছে ভুমজাইথাই, যা অন্য যেকোনো দলের তুলনায় অনেক বেশি। তবে এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় অনুতিন এখন জোট সরকার গঠনের লক্ষ্যে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছেন।
এই নির্বাচনকে অনেক বিশ্লেষক থাইল্যান্ডের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রবণতার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। গত এক বছরে দেশটির রাজনীতিতে জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত প্রশ্ন এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গত বছরের শেষ দিকে কম্বোডিয়ার সঙ্গে সীমান্তে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার পর থাইল্যান্ডে জাতীয়তাবাদী চেতনা নতুন করে জোরালো হয়। সেই আবহেই রোববার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভুমজাইথাই পার্টি ব্যাপক জনসমর্থন পেয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
ভুমজাইথাই পার্টি দীর্ঘদিন ধরেই সেনাবাহিনী ও রাজতন্ত্রের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। দলটির রাজনীতির মূল সুর হলো জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা, শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান। নির্বাচনী প্রচারণায় অনুতিন চার্নভিরাকুল বারবার সীমান্ত নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে থাইল্যান্ডের শক্ত অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। এতে করে শহর ও গ্রাম—উভয় পর্যায়ের ভোটারদের একটি বড় অংশ তার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
ব্যাংককের থাম্মাসাট বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের প্রভাষক ভিরত আলী মনে করেন, এই নির্বাচনের ফল খুব বড় কোনো নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে না। তাঁর ভাষায়, গত তিন মাসে থাইল্যান্ড যে গতিতে ও যে নীতিতে চলছিল, নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও সেটাই অব্যাহত থাকবে। জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, কম্বোডিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং বিদ্যমান অর্থনৈতিক নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। অর্থাৎ ভোটের মাধ্যমে জনগণ মূলত বর্তমান পথকেই সমর্থন দিয়েছে।
তবে এই বিজয়ের পাশাপাশি অনুতিন চার্নভিরাকুলের সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জও অপেক্ষা করছে। থাইল্যান্ডের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বর্তমানে স্থবির অবস্থায় রয়েছে। পর্যটন খাত ঘুরে দাঁড়ালেও শিল্প ও বিনিয়োগ খাতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শতকোটি ডলারের সাইবার অপরাধ চক্রের বিস্তার, যা শুধু অর্থনীতিই নয়, দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সরকার গঠন করতে পারলে এই দুই ইস্যু মোকাবিলা করাই হবে অনুতিনের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
নির্বাচনের ফলাফলে সংস্কারপন্থী ‘পিপলস পার্টি’ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। তারা প্রায় ১২০টি আসন পেয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক হিসাব। দলটি আগের নির্বাচনগুলোতে তরুণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেলেও এবারের নির্বাচনে সেই সমর্থন ধরে রাখতে পারেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও সীমান্ত উত্তেজনার মতো ইস্যু সামনে চলে আসায় সংস্কার ও কাঠামোগত পরিবর্তনের বার্তা কিছুটা আড়ালে চলে গেছে।
তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার দল ‘ফেউ থাই পার্টি’। ২০২৩ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবার দলটির ভোটের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর পেছনে একাধিক কারণ দেখছেন বিশ্লেষকেরা। এর মধ্যে অন্যতম হলো কম্বোডিয়ার সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে না পারার অভিযোগ, যার জেরে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে বাধ্য হন থাকসিনের মেয়ে পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা। এই ঘটনায় দলটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভোটারদের আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগে।
বর্তমানে থাকসিন সিনাওয়াত্রা দুর্নীতির দায়ে এক বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। যদিও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, একটি সমঝোতার মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ের আগেই তিনি মুক্তি পেতে পারেন। তবে আপাতত তার অনুপস্থিতি এবং নেতৃত্ব সংকট ফেউ থাই পার্টির জন্য বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার প্রভাব সরাসরি নির্বাচনের ফলাফলে পড়েছে।
ভোটারদের আচরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এবারের নির্বাচনে স্থিতিশীলতা ও শক্ত নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক হস্তক্ষেপের ইতিহাস এবং ঘন ঘন সরকার পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা থাইল্যান্ডের সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ক্লান্তি তৈরি করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে অনেক ভোটার পরিবর্তনের চেয়ে পরিচিত ও দৃঢ় অবস্থানকে বেছে নিয়েছেন, যা ভুমজাইথাই পার্টির পক্ষে গেছে।
জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে ইতিমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। ভুমজাইথাই পার্টি যদি মধ্যপন্থী বা ছোট দলগুলোর সমর্থন আদায় করতে পারে, তবে অনুতিন চার্নভিরাকুলের প্রধানমন্ত্রীত্ব আরও শক্ত ভিত পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে জোট রাজনীতির বাস্তবতায় নীতিগত সমঝোতা ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ হবে না।
আঞ্চলিক রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এই ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা বাড়ছে। থাইল্যান্ডের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা তাই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে রয়েছে। জাতীয়তাবাদী ও রক্ষণশীল শক্তির উত্থান আঞ্চলিক কূটনীতিতে থাইল্যান্ডকে আরও সতর্ক ও আত্মকেন্দ্রিক নীতির দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
সব মিলিয়ে, ভুমজাইথাই পার্টির এই বড় জয় থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী ধারার শক্ত অবস্থানকে আবারও নিশ্চিত করেছে। তবে এই বিজয় কতটা টেকসই হবে এবং সরকার গঠনের পর অনুতিন চার্নভিরাকুল কতটা দক্ষতার সঙ্গে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারেন, তার ওপরই নির্ভর করবে থাইল্যান্ডের আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপথ।