প্রকাশ:৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে প্রায় ২০ হাজার নাবিক ও ১৫ হাজার প্রমোদতরীর যাত্রী বর্তমানে আটকা পড়েছেন। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থা (আইএমও)-র প্রধান আর্সেনিও ডোমিঙ্গুয়েজ এই তথ্য জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতিতে নৌ-বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে স্থবির হয়ে পড়েছে। হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগরের বন্দরগুলোকে উন্মুক্ত সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত করে, এবং সাধারণ অবস্থায় বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ এই পথের মাধ্যমে হয়ে থাকে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের চলমান সামরিক উত্তেজনার কারণে প্রণালীটি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ইরান দাবি করেছে, তারা শুধুমাত্র চীনা জাহাজকে এই প্রণালী দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেবে। অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করলে সেটি লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে ইরানের সেনাবাহিনী সতর্ক করেছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরও জানিয়েছে, এখন তাদের প্রণালী পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং যে কোনো জাহাজকে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হবে এবং তেলের দাম আকাশচুম্বী হারে বৃদ্ধি পাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের লেকচারার হির্স আল-জাজিরাকে বলেছেন, যদি প্রণালী অর্ধেক সময়ও বন্ধ থাকে, তাহলে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। মার্কিন নৌবাহিনী এখন এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করা ট্যাংকারগুলোকে নিরাপদ রাখতে পারছে না, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করছে।
হির্স বলেন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও ইতিমধ্যেই প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। প্রথম দিনেই দাম ৪০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ডিজেলের দামও অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে, যা গ্যাসনির্ভর দেশগুলোকে পেট্রোলিয়াম মজুত করতে বাধ্য করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলের অঙ্গরাজ্যগুলোতে এই পরিস্থিতির বড় প্রভাব পড়বে, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালী আটকে যাওয়া নাবিক ও যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। প্রমোদতরীতে খাবার, পানি ও চিকিৎসা সামগ্রীর সরবরাহ সীমিত। অনেক নাবিক আক্ষেপ করেছেন যে, তারা দিনগুলোর মধ্যে সীমিত নিরাপত্তা এবং কম্পাস বা যোগাযোগের সুবিধার কারণে আতঙ্কে রয়েছেন। আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থা আইএমও এবং অন্যান্য সংগঠন এখন দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে অর্থনীতিতে এর প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। তেলের চরম দামের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গ্যাস-নির্ভর দেশগুলো ব্যাকআপ সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরিতে ব্যস্ত, যা বাজারের স্থিতিশীলতা আরও প্রভাবিত করছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, যদি যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর আকার নিতে পারে।
এ পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানবিক ও নিরাপত্তার জন্যও হুমকি সৃষ্টি করছে। আটকা পড়া নাবিক ও যাত্রীদের মধ্যে অসংখ্য শিশু ও বৃদ্ধ রয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে হবে, নাহলে প্রণালীতে দীর্ঘ সময় আটকে থাকা নাবিক ও যাত্রীরা তীব্র দুর্ভোগে পড়বেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রণালী বন্ধ থাকলে, বিশ্বের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ভারসাম্যও সরাসরি প্রভাবিত হবে। যুদ্ধবিরোধী কূটনৈতিক চেষ্টার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চললেও, বর্তমান সামরিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে।