প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর আরোপিত করের হার কমিয়ে ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে এই কর সুবিধা পেতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা কার্যক্রম বাড়ানো, ভাষা শিক্ষার প্রসার, ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব প্রতিষ্ঠা এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার মতো কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন। শিক্ষা খাতের উন্নয়ন, গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার লক্ষ্যে এসব উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান সরকারপ্রধান।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর করের চাপ কিছুটা কমানো হলে তারা শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে আরও বেশি বিনিয়োগের সুযোগ পাবে। তবে কর সুবিধার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সামাজিক দায়িত্ব পালনে আরও সক্রিয় হতে হবে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে ভাষা শিক্ষার প্রসার এবং ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বিশেষ গুরুত্ব দেন দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়ে। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থী যেন উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠান বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি, পরিচালন ব্যয় এবং বিভিন্ন কর কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, কর কমানোর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় তাদের আর্থিক সক্ষমতা ব্যবহার করে গবেষণা, শিক্ষক উন্নয়ন এবং শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করার সুযোগ পেতে পারে। তবে একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, কর সুবিধার প্রকৃত সুফল যেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যবহার হয়।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে দেশের কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, আধুনিক ও জনবান্ধব করার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কর ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমানো সরকারের লক্ষ্য।
প্রস্তাবিত বাজেটে কয়েকটি খাতে ভ্যাট কমানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তার মতে, অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকে গতিশীল করতে হলে কর কাঠামোকে বাস্তবসম্মত ও ব্যবসাবান্ধব করতে হবে।
এ সময় করের আওতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ব্যাংক হিসাব খোলা, বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন এবং সম্পত্তির মিউটেশনের ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, এ বিষয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ায় প্রস্তাবটি প্রত্যাহারের জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
ব্যক্তিগত করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাবও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সাধারণ করদাতাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়ের সীমা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ কর বছরের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাব করেন, সাধারণ করদাতাদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে এই সীমা আরও বাড়ানো যেতে পারে। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ কর বছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ কর বছরের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ কর বছরের জন্য ৫ লাখ টাকা করা যেতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের ওপর করের চাপ কিছুটা কমবে। একই সঙ্গে কর ব্যবস্থায় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে শিক্ষা ও কর ব্যবস্থার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। একদিকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে গবেষণা ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করার উদ্যোগ, অন্যদিকে কর ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ও গ্রহণযোগ্য করার পরিকল্পনা।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর কমানোর প্রস্তাব এখন বাজেট আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। সংসদীয় প্রক্রিয়া শেষে এটি চূড়ান্ত হলে দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে এর প্রভাব কী হবে, তা নির্ভর করবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দায়িত্বশীলতা ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কর কমানো নয়, এর সঙ্গে মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণার পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের সুযোগ বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। কারণ উচ্চশিক্ষার উন্নয়ন কেবল আর্থিক সুবিধার ওপর নির্ভর করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও মান নিয়ন্ত্রণের ওপরও নির্ভরশীল।
প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খাতে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি নতুন দায়িত্বও তৈরি হবে। কর সুবিধার সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।