প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার (JICA) ঋণের সুদের হার কমানোর জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপের আশঙ্কা থেকে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। জাইকার ঋণের বর্তমান সুদের হার থেকে অন্তত ১ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পক্ষে জাইকার প্রেসিডেন্ট বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে এই অনুরোধ জানানো হয়। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী জাপানের এই সংস্থার ঋণের শর্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে চিঠিতে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুধু চিঠি পাঠিয়েই বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না। ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়ে সরাসরি আলোচনার জন্য অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর জাপান সফরের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জাইকার প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকোর আসন্ন ঢাকা সফরেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরবে বাংলাদেশ।
জাইকার প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরে সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। এ সময় তিনি জাইকার সহায়তায় পরিচালিত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পও পরিদর্শন করবেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সফর দুই দেশের উন্নয়ন সহযোগিতার ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করবে।
গত এপ্রিল থেকে জাইকার নতুন সুদের হার কার্যকর হয়েছে। বর্তমানে জাইকার ঋণের সুদের হার ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ। এর আগে এই হার ছিল ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থায় ঋণের ব্যয় বেড়েছে।
শুধু মূল ঋণের সুদ নয়, পরামর্শক খাতে ঋণের সুদের হারও বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে এই হার ছিল শূন্য দশমিক ৮৫ শতাংশ, বর্তমানে তা বেড়ে ১ শতাংশ হয়েছে। তবে ঋণের মেয়াদ ৩০ বছর এবং রেয়াতকাল ১০ বছর অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। একইভাবে ঋণ প্রক্রিয়াকরণ মাশুল বা ফ্রন্ট-এন্ড ফিও আগের মতো শূন্য দশমিক ০২ শতাংশ রাখা হয়েছে।
জাইকা সাধারণত প্রতি ছয় মাস পরপর বিভিন্ন দেশের জন্য ঋণের শর্তাবলি পর্যালোচনা করে। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত বর্তমান সুদের হার আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা রয়েছে।
ইআরডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জাইকার ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি বাংলাদেশের উন্নয়ন অর্থায়নে চাপ তৈরি করতে পারে। কারণ দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কম সুদের ঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে অবকাঠামো, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সামাজিক খাতের প্রকল্পে ঋণের ব্যয় বেড়ে গেলে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় প্রভাব পড়তে পারে।
ইআরডির জাপান উইংয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ জাইকার সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ উন্নয়ন অংশীদারত্ব বজায় রেখে আসছে। গত সপ্তাহে পাঠানো চিঠির বিষয়ে জাপান সরকারের ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, জাইকার প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হবে। তবে সফরের সময়ই সুদের হার কমানোর বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা আসবে—এমন সম্ভাবনা কম। এজন্য অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দলের জাপান সফরের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আরও জানান, জাইকার ঢাকা অফিসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে সুদের হার নির্ধারণের বিষয়টি মূলত জাপানের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সুদের হার কমানোর পক্ষে কয়েকটি যুক্তিও তুলে ধরা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বাংলাদেশের বাজারে জাপানি পণ্যের বড় উপস্থিতি।
ইআরডির কর্মকর্তাদের মতে, জাইকা ঋণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে একই ধরনের শ্রেণিতে বিবেচনা করে। তবে বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ মিয়ানমারের তুলনায় অনেক বেশি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ জাপানি গাড়ির অন্যতম বড় বাজার এবং দুই দেশের মধ্যে শিল্প ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার ক্ষেত্রও বিস্তৃত।
এ ছাড়া বাংলাদেশ এখনো স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকায় রয়েছে এবং উত্তরণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জাইকার ঋণের শর্ত আরও সহনীয় হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ।
জাইকার সঙ্গে বাংলাদেশের ঋণ সম্পর্কের ইতিহাসও দীর্ঘ। এলডিসি হিসেবে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জাইকার কাছ থেকে মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ সুদে ঋণ পেয়েছে। পরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঋণের সুদের হার ধীরে ধীরে বেড়েছে।
২০২২ সালে বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় উন্নীত হওয়ার পর জাইকার ঋণের সুদের হার বেড়ে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ হয়। এরপর ২০২৩ সালে তা বেড়ে ১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ২ দশমিক ৩৫ শতাংশে পৌঁছায়। সর্বশেষ এপ্রিল ২০২৬ থেকে তা ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ হয়েছে।
তুলনামূলকভাবে বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন শর্তে ঋণ পেয়ে থাকে। বিশ্বব্যাংকের ঋণের বর্তমান সুদের হার প্রায় ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে নেওয়া ঋণের সুদের হার প্রকল্পভেদে ২ শতাংশ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ঋণের সুদের হার ২ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
ইআরডি কর্মকর্তারা বলছেন, জাইকার ঋণের সুদের হার বেড়ে গেলে এটি আগের মতো রেয়াতি ঋণের পর্যায়ে নাও থাকতে পারে। কোনো ঋণে অনুদান অংশ ৩৫ শতাংশের কম হলে সেটিকে কঠিন শর্তের ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এ ধরনের ঋণের চাপ সামলানো কঠিন হতে পারে।
জাইকা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের একটি। সাধারণত সংস্থাটি প্রতি বছর বাংলাদেশকে প্রায় ১৩০ কোটি ডলারের ঋণের প্রতিশ্রুতি দেয়। এর মধ্যে গড়ে ৬০ থেকে ৭০ কোটি ডলার ছাড় করা হয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে জাইকার অর্থ ছাড়ের গতি কিছুটা কমেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে সংস্থাটি বাংলাদেশকে ৪২ কোটি ২৪ লাখ ডলার ছাড় করেছে। একই সময়ে নতুন কোনো ঋণের প্রতিশ্রুতিও পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাইকার ঋণের সুদ কমানোর এই উদ্যোগ শুধু অর্থনৈতিক স্বস্তির জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন আরও টেকসই করার লক্ষ্যেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এখন নজর থাকবে জাপান সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং আসন্ন আলোচনার ফলাফলের দিকে।