ইরান যুদ্ধের মধ্যেই ইকুয়েডরে মার্কিন সামরিক অভিযান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২৬
  • ১৬ বার
ইরান যুদ্ধের মধ্যেই ইকুয়েডরে মার্কিন সামরিক অভিযান

প্রকাশ: ৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা যখন ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছে এবং ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাত আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, ঠিক সেই সময়েই দক্ষিণ আমেরিকার দেশ Ecuador-এ নতুন এক যৌথ সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে United States। দেশটির সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইকুয়েডরের সঙ্গে সমন্বয় করে মাদক সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনের লক্ষ্যে এই অভিযান শুরু করা হয়েছে। তবে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে Iranকে কেন্দ্র করে সংঘাতের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি সামরিক পদক্ষেপে জড়াল।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ড, অর্থাৎ United States Southern Command বুধবার এক বিবৃতিতে জানায়, ইকুয়েডরের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে দেশটিতে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে চিহ্নিত কয়েকটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এই গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচার, সহিংসতা ও সংগঠিত অপরাধের সঙ্গে জড়িত এবং তা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

এই অভিযানের নেতৃত্বে থাকা মার্কিন সাউদার্ন কমান্ডের প্রধান Francis Donovan এক বিবৃতিতে বলেন, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে মাদক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির বাস্তব উদাহরণ এই যৌথ অভিযান। তিনি বলেন, এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু অপরাধী গোষ্ঠীগুলোকে দমন করা নয়, বরং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।

মার্কিন বাহিনীর প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, অভিযানের অংশ হিসেবে সামরিক হেলিকপ্টারের উড্ডয়ন এবং আকাশ থেকে নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, আপাতত যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধ বা সংঘর্ষে অংশ নিচ্ছে না। বরং তারা ইকুয়েডরের সেনাবাহিনীকে গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং লজিস্টিক সাপোর্ট দিচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইকুয়েডরে মাদক চোরাচালান এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের ঘটনা দ্রুত বেড়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি বড় মাদক কার্টেলের রুট হিসেবে দেশটি ব্যবহৃত হওয়ায় সেখানে সহিংসতা ও নিরাপত্তা সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফলে ইকুয়েডর সরকার আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক সহযোগিতার বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে সামরিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষদিকে Israel ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে সামরিক হামলা শুরু করে, যা বৈশ্বিক রাজনীতিতে বড় ধরনের আলোড়ন তোলে।

এই হামলা শুরু হয় এমন সময় যখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরোক্ষ আলোচনা চলছিল। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, আলোচনার মাঝেই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ায় কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেক আইনপ্রণেতা অভিযোগ করেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করেছেন। ফলে বিরোধী রাজনীতিবিদদের সমালোচনার মুখে পড়েছে প্রশাসন।

এদিকে ইকুয়েডরে অভিযান শুরুর বিষয়ে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র Karoline Leavitt বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে লাতিন আমেরিকার অনেক অঞ্চলে মাদক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো সাধারণ মানুষের জীবনে ভয় ও সহিংসতা ছড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদার দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করছে।

তিনি আরও বলেন, অপরাধী গোষ্ঠীগুলো শুধু মাদক পাচারই করে না, বরং তারা দুর্নীতি, অস্ত্র পাচার এবং সহিংসতার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেও দুর্বল করে দেয়। তাই এসব সংগঠনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই লাতিন আমেরিকায় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে আসছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে Venezuelaকে ঘিরেও একটি বড় ধরনের মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করেছিল ওয়াশিংটন। সেই অভিযানে মার্কিন বাহিনী কয়েক ডজন জাহাজ ও নৌকা ধ্বংস করেছে বলে জানা যায়।

তবে ওই অভিযানে কয়েকশ মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। United Nationsসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এই ঘটনাগুলোকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার সময় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মেনে চলা জরুরি।

বর্তমানে ইকুয়েডরে যে অভিযান শুরু হয়েছে, সেটিকে অনেক বিশ্লেষক ট্রাম্প প্রশাসনের মাদকবিরোধী সামরিক কৌশলের নতুন ধাপ হিসেবে দেখছেন। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে মাদক চক্রের বিস্তার এবং সহিংসতার ঘটনা বাড়ছে।

অভিযান শুরুর ঠিক দুই দিন আগে ইকুয়েডরের রাজধানী Quito-তে দেশটির প্রেসিডেন্ট Daniel Noboa এবং প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন সাউদার্ন কমান্ডের প্রধান জেনারেল ফ্রান্সিস ডোনোভান। ওই বৈঠকে দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং মাদকবিরোধী কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।

ইকুয়েডর সরকার মনে করছে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া মাদক সন্ত্রাস মোকাবিলা করা কঠিন। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং সমুদ্রপথ ব্যবহার করে যেসব অপরাধী চক্র মাদক পাচার করে, তাদের দমন করতে উন্নত প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সহযোগিতা প্রয়োজন।

অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, সামরিক অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন। তাদের মতে, মাদক পাচারের মূল কারণ হিসেবে দারিদ্র্য, দুর্নীতি এবং সামাজিক বৈষম্যও বড় ভূমিকা রাখে। এসব সমস্যার সমাধান না করলে কেবল সামরিক পদক্ষেপ দিয়ে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়।

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে অনেকেই বহুমুখী কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং একই সময়ে লাতিন আমেরিকায় সামরিক সহযোগিতা—এই দুই ঘটনাই যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নিরাপত্তা কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে।

তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, একাধিক অঞ্চলে একই সঙ্গে সামরিক সম্পৃক্ততা বাড়ালে তা বৈশ্বিক উত্তেজনাও বাড়াতে পারে। ফলে আগামী দিনে এই অভিযানের প্রভাব শুধু ইকুয়েডর বা লাতিন আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও এর প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত