প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়েছে ইরাকে। দেশটির উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহর কিরকুকে ইরানপন্থী মিলিশিয়া জোটের একটি সামরিক ঘাঁটিতে রহস্যজনক বিমান হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত এবং আরও অন্তত ১৮ জন আহত হয়েছে। হামলার পর পুরো এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং ঘটনাটি ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে।
ইরাকি নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা আরবি জানিয়েছে, হামলাটি চালানো হয় দেশটির প্রভাবশালী শিয়া মিলিশিয়া জোট Popular Mobilization Forces-এর একটি ঘাঁটিতে। এই সংগঠনটি আরবি ভাষায় হাশদ আল-শাবি নামেও পরিচিত। সংগঠনটির ৪০তম ব্রিগেডের সদর দপ্তরকে লক্ষ্য করে পরপর দুটি বিমান হামলা চালানো হয় বলে জানা গেছে।
ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিরকুকের উপকণ্ঠে অবস্থিত ওই সামরিক স্থাপনায় প্রথম বিস্ফোরণের পরপরই দ্বিতীয় একটি হামলা ঘটে। শক্তিশালী বিস্ফোরণে ঘাঁটির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ঘটনাস্থলেই কয়েকজন নিহত হন। আহতদের দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে এই হামলার জন্য এখনো পর্যন্ত কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করেনি। কে বা কারা এই হামলা চালিয়েছে তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। ইরাকি নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ঘটনাটির তদন্ত শুরু করেছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য হামলাকারী শনাক্ত করার জন্য গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।
ঘটনার পরপরই কিরকুক শহর ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাতের আকাশে যুদ্ধবিমানের শব্দ শোনার পরপরই শক্তিশালী বিস্ফোরণের আওয়াজ শোনা যায়, যা অনেক দূর পর্যন্ত অনুভূত হয়।
ইরাকের সাম্প্রতিক ইতিহাসে Popular Mobilization Forces গুরুত্বপূর্ণ একটি সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচিত। ২০১৪ সালে জঙ্গি সংগঠন আইএস যখন ইরাকের বড় অংশ দখল করে ফেলে, তখন দেশটির শিয়া ধর্মীয় নেতৃত্বের আহ্বানে বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠী একত্র হয়ে এই বাহিনী গঠন করে। পরে এই জোটকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইরাকের নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এই বাহিনীর অনেক গোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ইরানপন্থী শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ফলে তাদের ঘাঁটিতে হামলার ঘটনা শুধু ইরাকের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক উত্তেজনার সঙ্গেও জড়িত বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
গত কয়েক বছরে ইরাকে বিভিন্ন সময়ে এমন হামলার ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্রদের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। ইরানের সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো মাঝে মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি বা কূটনৈতিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রও অতীতে এসব গোষ্ঠীর অবস্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে।
তবে কিরকুকের এই সাম্প্রতিক হামলার ক্ষেত্রে কোনো পক্ষ এখনো সরাসরি দায় স্বীকার না করায় পরিস্থিতি নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি হয়তো আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে চলমান ছায়া সংঘাতের অংশ হতে পারে। আবার কেউ কেউ বলছেন, ইরাকের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যেও মাঝে মাঝে সংঘর্ষ বা প্রতিশোধমূলক হামলা ঘটে থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই হামলার পর আতঙ্কে রাত কাটিয়েছেন। কিরকুক এমনিতেই বহু জাতিগোষ্ঠীর বসবাসের একটি সংবেদনশীল এলাকা। এখানে কুর্দি, আরব এবং তুর্কমেন সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত উত্তেজনা বিরাজ করছে।
হামলার পর ইরাকি সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে। নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থল ঘিরে রেখেছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য আরও হামলার আশঙ্কায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরাক এখনো একটি সংবেদনশীল যুদ্ধক্ষেত্রের মতো অবস্থায় রয়েছে। বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব, স্থানীয় রাজনৈতিক বিভাজন এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
কিরকুকের এই হামলা সেই বাস্তবতারই আরেকটি উদাহরণ বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও ঘটনাটির পেছনের প্রকৃত কারণ ও দায়ী পক্ষ সম্পর্কে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, তবু এটি স্পষ্ট যে এই হামলা ইরাকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এদিকে আহতদের চিকিৎসা চলছে এবং নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করার কাজও চলছে বলে ইরাকি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ পরে বিস্তারিত জানাবে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের হামলা শুধু একটি সামরিক ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কিরকুকের এই ঘটনার তদন্ত ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া এখন আন্তর্জাতিক মহলেরও নজরে রয়েছে।
বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয় প্রশাসন এবং নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং নতুন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।