প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনার মাত্রা বাড়িয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেলকেন্দ্র খারগ দ্বীপকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এবার অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট তেল ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছে তেহরান। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদরদফতরের এক মুখপাত্র এ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ওই মুখপাত্র বলেন, ইরানের তেল অবকাঠামোর ওপর কোনো ধরনের হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত এমন সব তেল ও জ্বালানি স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে, যেগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির অংশীদারিত্ব রয়েছে অথবা যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করে। তার ভাষায়, ইরানের তেল স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা হলে প্রতিক্রিয়া শুধু একটি জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ জড়িত সব জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
মুখপাত্র আরও বলেন, ইরানের তেল স্থাপনাগুলো দেশটির অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলোর ওপর হামলা হলে এর জবাব হবে কঠোর এবং তা হবে এমন মাত্রায়, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ জড়িত তেল ও জ্বালানি অবকাঠামো কার্যত অচল হয়ে পড়ে। তার দাবি, ইরান নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।
এই হুঁশিয়ারির পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক একটি উত্তেজনাপূর্ণ দাবি। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট Donald Trump সম্প্রতি দাবি করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের খারগ দ্বীপে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে শক্তিশালী বিমান হামলা চালিয়েছে। তার বক্তব্যে এই হামলাকে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম বড় সামরিক অভিযান হিসেবে তুলে ধরা হয়।
স্থানীয় সময় শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম Truth Social-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ড এই অভিযানে অত্যন্ত শক্তিশালী বিমান হামলা চালিয়েছে। তিনি দাবি করেন, মার্কিন বাহিনী ইরানের “মুকুটের মণি” হিসেবে পরিচিত খারগ দ্বীপের প্রতিটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, এখনো দ্বীপটির তেল অবকাঠামো ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে ইরান বা অন্য কেউ যদি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটির তেল স্থাপনাতেও হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
Kharg Island ইরানের জন্য অত্যন্ত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। পারস্য উপসাগরে অবস্থিত এই দ্বীপ থেকেই ইরানের বড় একটি অংশের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের মোট তেল রপ্তানির বড় অংশই এই দ্বীপের টার্মিনাল ও অবকাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে এই স্থাপনায় কোনো হামলা শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, খারগ দ্বীপকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়লে তা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্ববাজারে যে বিপুল পরিমাণ তেল সরবরাহ হয়, তার একটি বড় অংশ পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। এই পথটি বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা প্রায়ই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে তেল ও গ্যাসের মতো জ্বালানি সম্পদের সঙ্গে জড়িত যেকোনো সংঘাত দ্রুত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিফলিত হয়। খারগ দ্বীপকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। বিভিন্ন সময় পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই পক্ষের কঠোর বক্তব্য এবং সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হামলার হুমকি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোর উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে। এসব স্থাপনা শুধু সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনীতির জন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এসব স্থাপনায় হামলা হলে তা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমাধানই উত্তেজনা প্রশমনের সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও আশা করছে, দুই পক্ষ পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই সংলাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করবে।
তবে এখন পর্যন্ত দুই পক্ষের বক্তব্যে কঠোর অবস্থানই বেশি প্রতিফলিত হচ্ছে। ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তাদের তেল অবকাঠামোর ওপর হামলা হলে তা সরাসরি আঞ্চলিক জ্বালানি স্থাপনাগুলোর ওপর পাল্টা হামলার মাধ্যমে জবাব দেওয়া হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা এখন নির্ভর করছে পরবর্তী কূটনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপের ওপর। তবে বিশ্লেষকদের মতে, খারগ দ্বীপকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা যদি দ্রুত প্রশমিত না হয়, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার—দুই ক্ষেত্রেই বড় প্রভাব ফেলতে পারে।