প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর নতুন নিয়ম ও প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতিতে আবারও খুলছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। এবার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), কমানো হচ্ছে দালাল নির্ভরতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অভিবাসন ব্যয়ের সম্পূর্ণ দায়ভার বহন করবে নিয়োগকর্তা। ফলে বিদেশে কাজের স্বপ্ন দেখা হাজারো বাংলাদেশি কর্মীর জন্য এটি বড় সুখবর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সম্প্রতি মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিনের সঙ্গে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী আর রামানান শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন। বৈঠকে দুই দেশই স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করার বিষয়ে একমত হয়েছে।
মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশি শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। বিশেষ করে নির্মাণ, উৎপাদনশিল্প, কৃষি ও বিভিন্ন সেবা খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে অতীতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যয় এবং দালালচক্রের আধিপত্যের কারণে বহু কর্মী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে সেই সংকট কাটিয়ে আবারও কর্মী নিয়োগ শুরু করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘এমপ্লয়ার পেইস’ নীতি বাস্তবায়ন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এই নীতি অনুযায়ী বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে ভিসা, টিকিট, মেডিকেল, প্রশিক্ষণসহ যাবতীয় ব্যয় বহন করবে নিয়োগকর্তা। ফলে কর্মীদের উপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কমবে এবং দালাল নির্ভরতা কমে আসবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে অভিবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং শ্রমবাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে।
মালয়েশিয়া সরকার জানিয়েছে, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াটি একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচালিত হবে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে প্রার্থীদের যাচাই, দক্ষতা মিলানো এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হবে। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমে আসবে এবং প্রতারণার সুযোগ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দুই দেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শ্রমবাজার একবারে সম্পূর্ণভাবে না খুলে ধাপে ধাপে কর্মী নিয়োগ করা হবে। ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে নির্মাণ খাতে কিছু কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ভবিষ্যতে শিল্পখাতের চাহিদা অনুযায়ী ধীরে ধীরে আরও কর্মী নেওয়া হবে।
বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ বাংলাদেশি বৈধভাবে কর্মরত আছেন, যা দেশটির মোট বিদেশি শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ। এই বিপুল সংখ্যক কর্মীর পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন করে শ্রমবাজার চালু হলে আগামী এক বছরে আরও কয়েক দশ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রবাসী কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষা, মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ এবং উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রযুক্তি নির্ভর স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা চালু হলে অতীতের মতো বিশৃঙ্খলা বা অনিয়মের পুনরাবৃত্তি কম হবে। পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং তথ্য বিনিময় কার্যক্রম জোরদারের মাধ্যমেও কর্মীদের সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই আকর্ষণীয়। তুলনামূলক বেশি বেতন, নিয়মিত কর্মসংস্থান এবং ব্যবসা করার সুযোগ থাকায় অনেক প্রবাসী সেখানে আর্থিকভাবে সফল হয়েছেন। ফলে নতুন করে শ্রমবাজার চালু হলে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, শুধুমাত্র নীতিগত ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। অতীতে দালালচক্রের কারণে অনেক কর্মী অতিরিক্ত টাকা খরচ করে বিদেশে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তাই এবারের উদ্যোগ সফল করতে সরকার, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নতুন প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছ ব্যবস্থায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। কর্মীদের অধিকার সুরক্ষা, অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এটি দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।