জাতিসংঘ মহাসচিব পদে চার প্রার্থী আলোচনায়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১৫ বার
জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচন প্রার্থী

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতিসংঘের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ মহাসচিব নির্বাচনের নতুন পর্ব শুরু হতে যাচ্ছে এ বছর। বিদায়ী মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন মহাসচিব দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। পাঁচ বছরের জন্য নির্ধারিত এই পদে এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চারজন শীর্ষ প্রার্থী সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন। কূটনৈতিক মহল মনে করছে, এবারের নির্বাচন জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

জাতিসংঘের এই শীর্ষ পদ সাধারণত নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশ এবং সাধারণ পরিষদের অনুমোদনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। ফলে পাঁচ স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সমঝোতা এই নির্বাচনে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক উত্তেজনা, যুদ্ধ, জলবায়ু সংকট এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই নতুন মহাসচিব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

এবারের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন আর্জেন্টিনার কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক নিরাপত্তা ইস্যুতে বিশ্বব্যাপী সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছেন। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ইউক্রেন যুদ্ধকালীন পারমাণবিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে তার নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক মহলে তাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

রাফায়েল গ্রোসি বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা আইএইএ-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি একাধিক ভাষায় দক্ষ এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় ‘শাটল কূটনীতি’র জন্য পরিচিত। তবে তার বিরুদ্ধে কিছু সমালোচনাও রয়েছে, যেখানে অনেকে মনে করেন তিনি নির্দিষ্ট ইস্যুতে অতিরিক্ত সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন। তবুও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ক তাকে শক্ত অবস্থানে রেখেছে।

অন্যদিকে দ্বিতীয় শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন কোস্টা রিকার অর্থনীতিবিদ ও কূটনীতিক রেবেকা গ্রিনস্প্যান। তিনি বর্তমানে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা ইউএনসিটিএডি-এর নেতৃত্বে রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক বাণিজ্য, উন্নয়ন এবং লিঙ্গসমতা ইস্যুতে কাজ করে আসা গ্রিনস্প্যান নিজেকে সংস্কারপন্থী নেতা হিসেবে উপস্থাপন করছেন।

রেবেকা গ্রিনস্প্যান নির্বাচিত হলে তিনি হবেন ইতিহাসে প্রথম নারী জাতিসংঘ মহাসচিব। তিনি বারবার বহুপাক্ষিক সহযোগিতা ও সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, বর্তমান বিশ্বে জাতিসংঘকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামোয় রূপান্তর করা জরুরি।

তৃতীয় প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট ও জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সাবেক হাই কমিশনার মিশেল বাশেলে। তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং মানবাধিকার ও নারী অধিকার ইস্যুতে সুপরিচিত।

মিশেল বাশেলে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে বড় শক্তি হিসেবে দেখছেন। তবে তার প্রার্থিতা নিয়ে কিছু আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিতর্কও রয়েছে। বিশেষ করে মানবাধিকার সংক্রান্ত কিছু প্রতিবেদনে তার অবস্থান নিয়ে সমালোচনা হয়েছে, যা পশ্চিমা রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী হিসেবে আছেন সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সল। আফ্রিকার উন্নয়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে তার ভূমিকা তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করেছে। তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন।

ম্যাকি সল দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে জাতিসংঘ মহাসচিব পদের জন্য নিজেকে অভিজ্ঞ প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিক অংশগ্রহণের পক্ষে কথা বলছেন। আফ্রিকান মহাদেশ থেকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের নির্বাচন শুধু ব্যক্তি নির্ধারণের বিষয় নয়, বরং এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য ও জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ কাঠামোর দিকনির্দেশনার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের অবস্থান চূড়ান্ত ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলবে।

জাতিসংঘ মহাসচিব পদটি ঐতিহ্যগতভাবে একটি সমঝোতার পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই প্রার্থীদের ব্যক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং কূটনৈতিক সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নারী নেতৃত্ব, আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব এবং প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা ইস্যু বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে, নির্বাচনের আগের কয়েক মাসে বিভিন্ন দেশের সমর্থন-সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য সংকট, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এই নির্বাচনের আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সব মিলিয়ে জাতিসংঘের দশম মহাসচিব নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক তৎপরতা তীব্র হয়েছে। আগামী বছরের শুরুতেই যে নতুন নেতৃত্ব জাতিসংঘের দায়িত্ব গ্রহণ করবে, তার ওপর নির্ভর করবে বৈশ্বিক শান্তি, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত