বিসিক শিল্পনগরীতে চুয়াডাঙ্গায় অর্থনৈতিক নতুন গতি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৪১ বার
বিসিক শিল্পনগরীতে চুয়াডাঙ্গায় অর্থনৈতিক নতুন গতি

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চুয়াডাঙ্গার বিসিক শিল্পনগরী এখন আর কেবল পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে একটি সম্ভাবনাময় শিল্পাঞ্চল হিসেবে। সদর উপজেলার ডিঙ্গেদহ গ্রামে গড়ে ওঠা এই শিল্পনগরীতে একের পর এক কারখানা নির্মাণ, উৎপাদন কার্যক্রম শুরু এবং প্লট বিক্রির গতি বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে বদলে যেতে শুরু করেছে পুরো এলাকার অর্থনৈতিক চিত্র। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি এখন শুধু একটি শিল্প এলাকা নয়, বরং নতুন কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

২০২১ সালের জুন মাসে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ডিঙ্গেদহ এলাকায় ২৫ দশমিক ১২ একর জমির ওপর চুয়াডাঙ্গা বিসিক শিল্পনগরীর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। প্রায় ৪১ কোটি ৯২ লাখ ৪৮ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই শিল্পনগরীতে মোট ৭৮টি প্লট রয়েছে, যা পাঁচটি বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিভক্ত। আধুনিক শিল্পায়নের প্রয়োজনীয় সব অবকাঠামো এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে উদ্যোক্তারা সহজেই উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করতে পারেন।

শিল্পনগরীতে রয়েছে প্রশস্ত পাকা সড়ক, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ, পানির পাইপলাইন ও পাম্প, ডাম্পিং ইয়ার্ড, পুকুর, প্রশাসনিক অফিস এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক কোয়ার্টার। কৃষিভিত্তিক শিল্প, সার ও কীটনাশক উৎপাদন, স্টিল মিল, অ্যালুমিনিয়াম পণ্য এবং বিভিন্ন হালকা শিল্প স্থাপনের উপযোগী পরিবেশ এখানে তৈরি করা হয়েছে। এই অবকাঠামোগত সুবিধাগুলোই এখন উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করছে।

শুরুতে এই শিল্পনগরীতে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কম ছিল। অনেকেই ঝুঁকি ও অবকাঠামো নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। বর্তমানে সেখানে ছোট-বড় একাধিক কারখানা নির্মাণ চলছে এবং কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে উৎপাদন কার্যক্রমও শুরু করেছে। এতে করে পুরো এলাকায় একটি শিল্পায়নের গতি তৈরি হয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে নতুনভাবে নাড়া দিয়েছে।

২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রথম ধাপে প্লট বরাদ্দ শুরু হয়। এখন পর্যন্ত মোট ৩৬ জন উদ্যোক্তা ৪৩টি প্লট কিনেছেন। প্রতি শতক জমির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। বাকি ৩৫টি প্লট এখনো অবিক্রিত থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশা করছে, দ্রুত সময়ের মধ্যেই এসব প্লটও বিক্রি হয়ে যাবে। কারণ বর্তমানে উদ্যোক্তাদের মধ্যে আগ্রহ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।

চুয়াডাঙ্গা বিসিক শিল্পনগরীর সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো এটি স্থানীয় মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে। ইতোমধ্যেই কয়েকটি কারখানা চালু হওয়ায় আশেপাশের এলাকার মানুষ সেখানে কাজের সুযোগ পাচ্ছে। শ্রমিক, প্রযুক্তিবিদ, নিরাপত্তাকর্মী থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, পুরো শিল্পনগরী চালু হলে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

স্থানীয় উদ্যোক্তারাও এই শিল্পাঞ্চলকে ভবিষ্যতের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন। তারা মনে করছেন, ঢাকাসহ বড় শহরের তুলনায় এখানে উৎপাদন খরচ অনেক কম, জমির মূল্য তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী এবং পরিবহন সুবিধাও ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে। এসব কারণে নতুন উদ্যোক্তারা এখানে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন।

তবে উদ্যোক্তারা কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করছেন। তাদের মতে, শিল্পনগরীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। অনেক উদ্যোক্তা মনে করছেন, আর্থিক সহায়তা এবং নীতিগত সহযোগিতা বাড়ানো গেলে এই শিল্পনগরী খুব দ্রুতই একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

কৃষাণ অ্যাগ্রো কেমিক্যালসের মালিক ফেরদৌস জানান, এখানকার পরিবেশ শিল্প স্থাপনের জন্য উপযোগী হলেও নিরাপত্তা ও আর্থিক সহায়তা আরও উন্নত করা দরকার। তিনি মনে করেন, ব্যাংকিং সাপোর্ট সহজ হলে উৎপাদন অনেক দ্রুত বাড়বে এবং উদ্যোক্তারা আরও উৎসাহিত হবেন।

অন্যদিকে সুইট এগ্রোভেটের মালিক মনজুরুল হুদা বলেন, চুয়াডাঙ্গায় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললে খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কম হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থাও উন্নত হওয়ায় ব্যবসা পরিচালনা সহজ হচ্ছে। তিনি মনে করেন, এই শিল্পনগরী স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং বিদেশি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করবে।

বিসিক কর্তৃপক্ষও এই অগ্রগতিতে আশাবাদী। চুয়াডাঙ্গা বিসিকের উপ-ব্যবস্থাপক এ বি এম আনিসুজ্জামান জানান, বর্তমানে প্লট বিক্রির গতি সন্তোষজনক এবং উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বলেন, কিছু কারখানায় ইতোমধ্যে উৎপাদন শুরু হয়েছে এবং আরও অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের লক্ষ্য হলো আগামী দুই বছরের মধ্যে বাকি প্লটগুলোও বিক্রি সম্পন্ন করা এবং পুরো শিল্পনগরীকে উৎপাদনমুখী করা।

তিনি আরও জানান, উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সব সুবিধা নিশ্চিত করতে বিসিক কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, সেবা সহজীকরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের বিশ্বাস, এই শিল্পনগরী চুয়াডাঙ্গা জেলাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

স্থানীয় অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, চুয়াডাঙ্গা বিসিক শিল্পনগরী শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং এটি একটি অর্থনৈতিক রূপান্তরের সূচনা। এখানে শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ধীরে ধীরে শিল্পনির্ভর অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হবে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে, আয় বৃদ্ধি পাবে এবং সামগ্রিকভাবে জীবনমান উন্নত হবে।

সব মিলিয়ে চুয়াডাঙ্গা বিসিক শিল্পনগরী এখন সম্ভাবনার এক নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনা, নীতিগত সহায়তা এবং উদ্যোক্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অব্যাহত থাকলে এটি ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম সফল ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত