প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. আব্দুল মান্নানকে বিচারিক ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অসৌজন্যমূলক আচরণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সৃষ্ট ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতির দপ্তর থেকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়।
প্রধান বিচারপতির দপ্তর ও সুপ্রিম কোর্ট সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বিচারপতি আব্দুল মান্নানকে আপাতত বিচারিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে তিনি হাইকোর্টের কোনো বেঞ্চে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না এবং দৈনন্দিন বিচারিক কার্যতালিকা থেকেও তার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ৩ এপ্রিল কুমিল্লায় একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে। সেখানে একটি ক্লাবের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন নিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে বিচারপতি আব্দুল মান্নান উপস্থিত হন বলে জানা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি অনুযায়ী, তিনি সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন, তবে এক পর্যায়ে উপস্থিত কিছু ব্যক্তির সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা শুরু হয় এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
সেই সময়ের একটি ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা বিচারপতিকে ঘিরে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয় এবং বিচার বিভাগের শৃঙ্খলা ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, ভিডিওটি প্রকাশের পর বিষয়টি প্রধান বিচারপতির নজরে আসে। এরপর বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে দ্রুত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। প্রাথমিকভাবে তাকে বিচারিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং বিষয়টি পর্যালোচনার আওতায় আনা হয়।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচার বিভাগের উচ্চপদস্থ কোনো ব্যক্তির আচরণ জনসমক্ষে বিতর্ক তৈরি করলে তা বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে তারা একই সঙ্গে মত দিয়েছেন, পুরো বিষয়টি আরও স্বচ্ছ ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করা উচিত।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ বিচার বিভাগের শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন, আবার অনেকে বিষয়টি নিয়ে সংযতভাবে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। সাধারণ নাগরিকদের একাংশ মনে করছেন, বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষায় যেকোনো সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নেওয়া উচিত।
জানা যায়, বিচারপতি মো. আব্দুল মান্নান ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। এর আগে তিনি দীর্ঘদিন জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিচার বিভাগে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকলেও সাম্প্রতিক ঘটনাটি তার পেশাগত জীবনে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক সূত্র আরও জানায়, পুনর্গঠিত বেঞ্চের কার্যতালিকা থেকে তার নাম বাদ দেওয়ার পর এখন তিনি কোনো বিচারিক বেঞ্চে বসতে পারবেন না। বিষয়টি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে বলে জানা গেছে।
এদিকে আইনজ্ঞ ও বিচার বিশ্লেষকদের মতে, বিচারপতিদের আচরণ শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নয়, বরং তা রাষ্ট্রীয় বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই যেকোনো ধরনের বিতর্ক এড়াতে বিচারকদের সর্বোচ্চ সংযম ও পেশাদার আচরণ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তারা আরও বলেন, আধুনিক বিচার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা ধরে রাখতে হলে এমন ঘটনাগুলো দ্রুত ও সঠিকভাবে সমাধান করা প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিচারপতি আব্দুল মান্নানের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, বিষয়টি প্রশাসনিক ও বিচারিক পর্যায়ে আরও পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, একজন উচ্চ আদালতের বিচারকের বিচারিক দায়িত্ব থেকে সাময়িক সরিয়ে দেওয়ার এই ঘটনা দেশের বিচার ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এটি শুধু একজন ব্যক্তির বিষয় নয়, বরং বিচার বিভাগের শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও জনআস্থার প্রশ্নকেও সামনে এনেছে।