নবম পে স্কেল ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৩ বার
নবম পে স্কেল ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে ধাপে ধাপে এগোনোর সুপারিশ করেছে সংশ্লিষ্ট কমিটি, যা ইতোমধ্যে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ লক্ষ্যে বিশেষ বরাদ্দ রাখার একটি নীতিগত সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা হয়েছে, যদিও বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

সম্প্রতি সরকার জাতীয় বেতন কমিশন, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিশনের সুপারিশ প্রণয়নের জন্য একটি পুনর্গঠিত কমিটি গঠন করে। এই কমিটি সরকারি চাকরিজীবীদের বর্তমান বেতন কাঠামো, বাজারদর, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে একটি সমন্বিত প্রস্তাবনা তৈরি করেছে। সেই প্রস্তাবনাতেই ধাপে ধাপে নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, দেশের আর্থিক চাপ এবং বাজেট ঘাটতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই একবারে পুরো পে স্কেল বাস্তবায়নের পরিবর্তে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে সরকারি কর্মচারীরা ধীরে ধীরে বেতন বৃদ্ধি পাবেন, অন্যদিকে সরকারের ওপর হঠাৎ করে বড় ধরনের আর্থিক চাপও পড়বে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সচিব পর্যায়ের কমিটি ইতোমধ্যে এই সুপারিশগুলো পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি বলেন, “আসন্ন বাজেটে এ বিষয়ে বিশেষ বরাদ্দ রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে ধাপে ধাপে নবম পে স্কেল বাস্তবায়ন শুরু হবে।”

প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে মূল বেতন বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হবে। এতে কর্মচারীদের জন্য একটি ধারাবাহিক উন্নতির সুযোগ তৈরি হবে এবং একই সঙ্গে সরকারের জন্যও আর্থিক ব্যবস্থাপনা সহজ হবে।

উল্লেখ্য, সর্বশেষ অষ্টম পে স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। সেই হিসেবে প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সরকারি চাকরিজীবীরা একই কাঠামোর মধ্যে রয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নতুন পে স্কেলের প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার নবম পে স্কেলের সুপারিশ প্রণয়নের জন্য নতুন পে কমিশন গঠন করে। পরবর্তীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই এই কমিশন তাদের সুপারিশ জমা দেয়। সেই সুপারিশেই বেতন কাঠামোর একটি বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো অনুযায়ী, সর্বনিম্ন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত দাঁড়ায় ১:৮, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালের প্রথম বেতন কমিশনে এই অনুপাত ছিল ১:১৫.৪ এবং ২০১৫ সালের অষ্টম পে স্কেলে তা ছিল ১:৯.৪। নতুন প্রস্তাবে এই অনুপাত কমিয়ে আনার মাধ্যমে বেতন বৈষম্য কমানোর একটি চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

বর্তমান বাস্তবতায় একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় কর্মরত ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা। বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা যোগ করলে মোট বেতন দাঁড়ায় প্রায় ১৬ হাজার ৯৫০ টাকা। কিন্তু প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী, একই গ্রেডের কর্মচারীর মূল বেতন হবে ২০ হাজার টাকা এবং ভাতাসহ মোট বেতন দাঁড়াবে প্রায় ৪১ হাজার ৯০৮ টাকা। অর্থাৎ, প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি ঘটবে।

একইভাবে ১৯তম গ্রেড থেকে শুরু করে প্রথম গ্রেড পর্যন্ত বেতন ও ভাতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। তবে উচ্চ গ্রেডের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে কম রাখা হয়েছে, যাতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি ইতিবাচক দিক, কারণ এতে নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা বেশি উপকৃত হবেন।

প্রস্তাবিত কাঠামোয় বিভিন্ন ধরনের ভাতা যেমন যাতায়াত ভাতা, টিফিন ভাতা, ধোলাই ভাতা এবং ঝুঁকিভাতাও পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে ভাতা বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম রাখা হয়েছে, বিশেষ করে যেখানে গাড়ি সুবিধা বা নগদায়নের মতো অতিরিক্ত সুবিধা রয়েছে। এর ফলে সামগ্রিকভাবে একটি সুষম কাঠামো তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।

এছাড়া বর্তমানে চালু থাকা ১০ শতাংশ এবং ১৫ শতাংশ বিশেষ ভাতা নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে করে কর্মচারীরা হঠাৎ করে কোনো সুবিধা হারাবেন না, বরং ধাপে ধাপে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আসবেন।

বিশ্লেষকদের মতে, নবম পে স্কেলের এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তা শুধু সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে না, বরং দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কারণ, বেতন বৃদ্ধি পেলে ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, যা বাজারে চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল করতে পারে।

তবে এর পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বড় পরিসরে বেতন বৃদ্ধি মানে সরকারের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়া। তাই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তকে একটি বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, নবম পে স্কেল নিয়ে দীর্ঘদিনের অপেক্ষা শেষ হওয়ার পথে। এখন প্রয়োজন দ্রুত এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত, যাতে সরকারি কর্মচারীরা তাদের প্রাপ্য সুবিধা পেতে পারেন এবং দেশের প্রশাসনিক কাঠামো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। আসন্ন বাজেট এই বিষয়ে কী বার্তা দেয়, সেটিই এখন সবার নজরে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত