প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে বিয়ের বাড়তি খরচ সামাল দিতে ব্যাংকিং খাতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘বিবাহ ঋণ’ বা ব্যক্তিগত ঋণের একটি বিশেষ ব্যবহার। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিয়ের আয়োজনও অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাস্তবতায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ভোক্তা ঋণের আওতায় আলাদা বা সমন্বিতভাবে বিয়ের জন্য ঋণ সুবিধা দিচ্ছে, যা অনেকের জন্য স্বস্তির বিষয় হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সব ব্যাংক এখনো সমানভাবে এই খাতে সক্রিয় হয়নি। কিছু ব্যাংক ‘ম্যারেজ লোন’ নামে আলাদা পণ্য চালু করলেও অনেক প্রতিষ্ঠান সাধারণ পার্সোনাল লোনকেই বিয়ের খরচ মেটাতে ব্যবহার করার সুযোগ দিচ্ছে।
বর্তমানে দেশের কয়েকটি ব্যাংক ব্যক্তিগত ঋণের মাধ্যমে বিয়ের খরচ মেটানোর সুযোগ দিচ্ছে। এনসিসি ব্যাংক এ ক্ষেত্রে তুলনামূলক বড় অঙ্কের ঋণ প্রদান করছে, যেখানে এক লাখ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ বিশ লাখ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী এবং সম্পদশালী ব্যক্তিরা এই সুবিধা নিতে পারেন। ঋণ পরিশোধের সময়সীমা সাধারণত এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত নির্ধারিত থাকে। তবে এখানে মাসিক আয়ের একটি শর্ত রয়েছে, যেখানে চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম মাসিক আয় ত্রিশ হাজার টাকা এবং অন্যান্য পেশার ক্ষেত্রে চল্লিশ হাজার টাকা থাকতে হয়।
অন্যদিকে উত্তরা ব্যাংক তুলনামূলক ছোট পরিসরে বিয়ের জন্য ঋণ সুবিধা দিয়ে থাকে। এখানে পঁচিশ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যায়, যা এক থেকে তিন বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়। এই ধরনের ঋণ সাধারণত মধ্যবিত্ত পরিবারের ছোট ও সীমিত বাজেটের বিয়ের খরচ মেটাতে সহায়তা করে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক বা এমটিবি ব্যক্তিগত ঋণের আওতায় দুই লাখ থেকে বিশ লাখ টাকা পর্যন্ত বিয়ের জন্য ঋণ দেয়। এখানে ২১ থেকে ৬৫ বছর বয়সি চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীরা আবেদন করতে পারেন। একইভাবে ইউসিবি ব্যাংকও বিয়ের খরচের জন্য সর্বোচ্চ বিশ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদান করে, যেখানে পরিশোধের সময়সীমা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত হতে পারে।
তবে সব আবেদনকারী এই সুবিধা পান না। যাদের নিয়মিত আয়ের উৎস নেই, যাদের পেশা অনিশ্চিত বা অস্থায়ী, কিংবা যারা ব্যাংকের ঋণ ইতিহাসে দুর্বল অবস্থানে আছেন, তাদের জন্য এই ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অতীতের ঋণ খেলাপির ইতিহাস থাকলেও আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
নীতিগতভাবে, ২১ থেকে ৬৫ বছর বয়সি বাংলাদেশি নাগরিকরা এই ঋণের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হন। চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ী ছাড়াও কিছু বিশেষ শ্রেণির ক্ষেত্রে আলাদা বয়সসীমা ও শর্ত প্রযোজ্য হয়। উদাহরণ হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্যের ক্ষেত্রে বয়সসীমা নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা থাকে।
ঋণ গ্রহণের জন্য আবেদনকারীদের বেশ কিছু নথি জমা দিতে হয়। এর মধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট, সাম্প্রতিক ছবি, আয় সংক্রান্ত প্রমাণপত্র, ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং পেশার প্রমাণপত্র অন্তর্ভুক্ত থাকে। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্সও প্রয়োজন হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংক অতিরিক্ত নিরাপত্তা হিসেবে অনাপত্তি সনদও চেয়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিবাহ ঋণ মূলত ভোক্তা ঋণেরই একটি সম্প্রসারিত রূপ হলেও এটি মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সাময়িক আর্থিক স্বস্তি এনে দিতে পারে। তবে অতিরিক্ত ঋণ নির্ভরতা ভবিষ্যতে আর্থিক চাপ বাড়াতে পারে বলেও তারা সতর্ক করছেন।
বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় বিয়ের ব্যয় দিন দিন বাড়ছে। ভেন্যু, খাবার, পোশাক ও অন্যান্য আয়োজনের খরচ অনেক সময় পরিবারগুলোর সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে ব্যাংকিং খাতের এই ধরনের ঋণ সুবিধা অনেক পরিবারকে বিকল্প সমাধান দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বিবাহ ঋণ এখন শুধু একটি ব্যাংকিং পণ্য নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত একটি সমাধান হিসেবে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঋণ ব্যবহারে সচেতনতা জরুরি, যাতে এটি ভবিষ্যতে অতিরিক্ত আর্থিক চাপের কারণ না হয়।