প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরান যুদ্ধজনিত ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর সম্ভাব্য চাপের প্রেক্ষাপটে ইউরোপের বিমান চলাচল খাত নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও আসন্ন গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে ফ্রান্সে বড় ধরনের ফ্লাইট বিপর্যয়ের সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন দেশটির পরিবহন মন্ত্রী ফিলিপ তাবারো। তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ও এয়ারলাইনসগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে এবং এখন পর্যন্ত বড় কোনো ফ্লাইট বাতিলের আশঙ্কা দেখা দেয়নি।
শুক্রবার দেওয়া এক বক্তব্যে ফিলিপ তাবারো বলেন, গ্রীষ্মকালীন মৌসুম এয়ারলাইনসগুলোর জন্য সবচেয়ে লাভজনক সময় হওয়ায় তারা স্বাভাবিকভাবে ফ্লাইট বাতিলের পথে যাবে না। বরং সীমিত কিছু ক্ষেত্রে ফ্লাইট সংখ্যা সামান্য কমানো হলেও সামগ্রিকভাবে যাত্রী পরিবহন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে।
ফরাসি পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং জেট ফুয়েল সরবরাহ নিয়ে সম্ভাব্য সংকটের বিষয়টি সরকার আগেই বিবেচনায় নিয়েছে। সেই অনুযায়ী এয়ারলাইনসগুলোর জন্য একাধিক আর্থিক ও প্রশাসনিক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে তারা চাপ মোকাবিলা করতে পারে।
এয়ারলাইনস অপারেটর ট্রান্সাভিয়া ফ্রান্স জানিয়েছে, তারা মে ও জুন মাসে তাদের মোট ফ্লাইটের মাত্র দুই শতাংশ বাতিল করেছে। প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং যাত্রীসেবা ব্যাহত না করে ফ্লাইট পরিচালনা চালিয়ে যাওয়া তাদের অগ্রাধিকার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ইরান যুদ্ধের প্রভাব ধীরে ধীরে বিমান খাতেও পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে জেট ফুয়েলের দাম ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় ইউরোপের বিভিন্ন এয়ারলাইনস খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু রুট পুনর্বিন্যাস করছে।
ফ্রান্স সরকার এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এয়ারলাইনসগুলোর জন্য কয়েকটি বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা অবদানের অর্থ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো, কর পরিশোধের ক্ষেত্রে নমনীয়তা প্রদান এবং জ্বালানি লোডিং ব্যবস্থায় অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বিমান সংস্থাগুলোর আর্থিক চাপ কিছুটা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
পরিবহন মন্ত্রী ফিলিপ তাবারো আরও বলেন, সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং যাত্রীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি আশ্বস্ত করেন যে গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণ মৌসুমে ফ্রান্সের বিমানবন্দরগুলোতে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা বা ফ্লাইট বাতিলের পরিস্থিতি তৈরি হবে না।
ইউরোপীয় বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা। ইউরোপ তার প্রয়োজনীয় জেট ফুয়েলের প্রায় ৭৫ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে, যা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে।
এই নির্ভরতার কারণে যেকোনো সংঘাত বা যুদ্ধ পরিস্থিতি সরাসরি বিমান চলাচল খাতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে তারা মনে করছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করছে, যাতে সরবরাহ চেইন ব্যাহত না হয়।
এদিকে ফরাসি পর্যটন খাতও এই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। গ্রীষ্মকালীন ছুটির মৌসুমে ইউরোপজুড়ে পর্যটক প্রবাহ বৃদ্ধি পায়, ফলে বিমান চলাচল স্বাভাবিক রাখা অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বড় ধরনের ফ্লাইট বিপর্যয় ঘটলে পর্যটন খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এয়ারলাইনস সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে বুকিং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং যাত্রীদের মধ্যে বড় কোনো উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে না। তবে তারা স্বীকার করেছেন যে জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা থাকায় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
ফ্রান্স সরকার ও এয়ারলাইনসগুলোর যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ফ্রান্সে আপাতত বড় ধরনের ফ্লাইট বিপর্যয়ের আশঙ্কা না থাকলেও জ্বালানি সরবরাহ ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ভবিষ্যৎ বিমান চলাচলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।