প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র জগতের এক জীবন্ত কিংবদন্তি বর্ষীয়ান অভিনেত্রী ডলি জহুর তাঁর দীর্ঘ অভিনয় জীবনের অভিজ্ঞতা, অর্জন এবং সাম্প্রতিক সময়ের মানসিক কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন এক আবেগঘন সাক্ষাৎকারে। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয় জগতে বিচরণ করা এই জনপ্রিয় অভিনেত্রী জানিয়েছেন, তিনি কখনো ভাবেননি যে একসময় তাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেগেটিভ মন্তব্য বা সমালোচনার মুখোমুখি হতে হবে।
অভিনেত্রী বলেন, জীবনের শুরুতে তিনি শুধুই ভালোবাসা, সম্মান এবং দর্শকের প্রশংসা পেয়েছেন। সেই সময়কার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানান, তখনকার দর্শকদের ভালোবাসা ছিল নিখাদ এবং আন্তরিক। তিনি কখনো কল্পনাও করেননি যে বয়সের এই পর্যায়ে এসে তাকে নেতিবাচক মন্তব্য সহ্য করতে হবে।
ডলি জহুর আবেগভরা কণ্ঠে বলেন, মানুষ যে নেগেটিভ কথা বলতে পারে, তা তিনি এখন বুঝতে পারছেন, তবে মানতে কষ্ট হচ্ছে। তিনি মনে করেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই প্রবীণ শিল্পীদের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যায়, যা তাকে মানসিকভাবে আঘাত করে। তাঁর ভাষায়, আমাদের দেশে বয়স্ক শিল্পীদের নিয়ে আগ্রহ কমে যাওয়া একটি বাস্তবতা, যা তিনি এখন উপলব্ধি করছেন।
দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের ক্যারিয়ারের সাফল্য নিয়েও কথা বলেন। তিনি জানান, ৫০ বছরের অভিনয় জীবনে তিনি অসংখ্য দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছেন, যা তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। বিভিন্ন নাটক, চলচ্চিত্র এবং মঞ্চে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি যে পরিচিতি ও সম্মান অর্জন করেছেন, তা তার জীবনের গর্বের অংশ।
তবে বর্তমান সময়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলেছে বলে জানান এই বর্ষীয়ান অভিনেত্রী। তিনি বলেন, আগে দর্শকের ভালোবাসা সরাসরি অনুভব করা যেত, কিন্তু এখন একটি ছোট্ট মন্তব্যও মানুষের মন ভেঙে দিতে পারে। তার মতে, অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তাদের একটি কমেন্ট অন্য মানুষের মানসিক অবস্থার ওপর কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আজকাল অনেকেই মুহূর্তের মধ্যে মন্তব্য করে ফেলেন, কিন্তু সেই মন্তব্য একজন শিল্পীর ভিত পর্যন্ত নাড়িয়ে দিতে পারে—এটা অনেকেই উপলব্ধি করেন না। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি তাকে গভীরভাবে কষ্ট দেয় বলে জানান তিনি।
ডলি জহুর আক্ষেপ করে বলেন, তিনি আগে কখনো ভাবেননি যে তার গায়ে কোনো ধরনের নেতিবাচক দাগ লাগতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা এখন ভিন্ন। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে, যা তার জন্য মানসিকভাবে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
তিনি আরও জানান, জীবনের এই পর্যায়ে এসে তার সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো—আগের মতো দর্শকের নিঃশর্ত ভালোবাসা তিনি আর অনুভব করছেন না। তবে একই সঙ্গে তিনি কৃতজ্ঞ যে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা, সম্মান এবং স্বীকৃতি পেয়েছেন।
মৃত্যু এবং পরবর্তী স্মৃতি নিয়েও তিনি কিছুটা আবেগপ্রবণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, মানুষ মারা যাওয়ার পর তাকে স্মরণ করবে কিনা বা দোয়া করবে কিনা—এ নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তবে এই ভাবনা তিনি বেশি দীর্ঘ করতে চান না, কারণ এতে মানসিকভাবে আরও কষ্ট বাড়ে।
বিনোদন জগতের অনেকেই মনে করছেন, প্রবীণ শিল্পীদের নিয়ে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। ডলি জহুরের মতো অভিজ্ঞ শিল্পীরা যেভাবে দীর্ঘদিন ধরে দেশের সংস্কৃতি ও বিনোদন জগতে অবদান রেখে আসছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহানুভূতিশীল আচরণ সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিস্তার একদিকে যেমন শিল্পীদের জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে, অন্যদিকে তেমনি সমালোচনার চাপও বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে অনেক সময় শিল্পীদের মানসিক স্বাস্থ্যও এর দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ডলি জহুর-এর এই বক্তব্য শুধু একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত আক্ষেপ নয়, বরং পুরো বিনোদন জগতের একটি বাস্তব চিত্রও তুলে ধরে। তার কথায় ফুটে উঠেছে দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অর্জন, ভালোবাসার স্মৃতি এবং আধুনিক সময়ের সমালোচনার চাপ—যা একসঙ্গে একজন শিল্পীর জীবনকে কতটা জটিল করে তুলতে পারে।