এপ্রিলে সড়কে প্রাণহানি ৪০৪, উদ্বেগজনক চিত্র

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৬ মে, ২০২৬
  • ৫ বার
এপ্রিলে সড়কে গেল ৪০৪ প্রাণ

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আবারও গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সদ্য প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে সারা দেশে মোট ৪৬৩টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে, যেখানে প্রাণ হারিয়েছেন ৪০৪ জন এবং আহত হয়েছেন ৭০৯ জন। সড়ক দুর্ঘটনার এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান আবারও দেশের পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার ঘাটতিকে সামনে নিয়ে এসেছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বুধবার (৬ মে) এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, অনলাইন সংবাদ মাধ্যম, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এই পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার একটি বড় অংশ ঘটেছে মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে, যেখানে যানবাহনের বেপরোয়া গতি এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাই মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট দুর্ঘটনার মধ্যে ১৬৮টি ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে, ১৯৩টি আঞ্চলিক সড়কে, ৪৫টি গ্রামীণ সড়কে এবং ৫৭টি শহরের সড়কে। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৯৭টি ঘটনা মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণে ঘটেছে, ১৯৪টি ঘটেছে নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে, ১০৬টি পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়ার ফলে এবং ৫২টি ঘটেছে যানবাহনের পেছনে আঘাতের কারণে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৪২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১১৩ জন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ২৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণদের মধ্যে মোটরসাইকেল ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই ধরনের দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

এছাড়া পথচারীদের নিরাপত্তাহীনতাও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এপ্রিল মাসে ১০২ জন পথচারী সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ২৫ দশমিক ২৪ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুটপাতের অনুপস্থিতি, অনিয়ন্ত্রিত রাস্তা পারাপার এবং যানবাহনের বেপরোয়া গতি এই মৃত্যুর অন্যতম কারণ।

চালক ও তাদের সহকারীদের মৃত্যুর সংখ্যাও কম নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪৬ জন চালক ও সহকারী দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন, যা পেশাদার পরিবহন খাতের নিরাপত্তা ঝুঁকিকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

সামগ্রিকভাবে এপ্রিল মাসে দুর্ঘটনায় মোট ৬৫৯টি যানবাহন জড়িত ছিল। এর মধ্যে বাস ৮৪টি, ট্রাক ৯১টি, মোটরসাইকেল ১৫৩টি এবং থ্রি-হুইলার ১১২টি। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, সড়কে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি রয়েছে।

সময়ের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে সকালে, যা মোট দুর্ঘটনার ২৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। রাতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা প্রায় ১৯ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সকালে যানবাহনের চাপ বেশি থাকা এবং রাতে আলোর অভাব ও ক্লান্ত চালকের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।

বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। সেখানে ১০৯টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১০২ জন। সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে সিলেট বিভাগে, যেখানে ১২টি দুর্ঘটনায় ১২ জন নিহত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকাতেই ৩৬টি দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত এবং ৬৭ জন আহত হয়েছেন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন তাদের প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, খারাপ সড়ক অবকাঠামো, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা, মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচল, তরুণদের অনিয়ন্ত্রিত মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সড়ক দুর্ঘটনা এখন শুধু একটি পরিবহন সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে বহু মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন, যা পরিবার ও সমাজে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সৃষ্টি করছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে কঠোর আইন প্রয়োগ, চালকদের প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি এবং আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জরুরি। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন ছাড়া এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।

মানবাধিকার কর্মীরাও এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, সড়কে প্রতিদিন যে সংখ্যায় মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন, তা প্রতিরোধযোগ্য। তাই সরকার, প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

সব মিলিয়ে এপ্রিল মাসের সড়ক দুর্ঘটনার এই পরিসংখ্যান আবারও দেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বল চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিটি মৃত্যুই একটি পরিবারকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে, যা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপরও বড় প্রভাব ফেলছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত