প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও জনবহুল নগরী মেক্সিকো সিটি যেন ধীরে ধীরে নিজের ওজনেই ডুবে যাচ্ছে। শহরের মানুষ প্রতিদিনের জীবনযাত্রা চালিয়ে গেলেও মাটির নিচে চলছে এক নীরব বিপর্যয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পরিবর্তন এতটাই দ্রুত এবং দৃশ্যমান যে এখন তা মহাকাশ থেকে তোলা স্যাটেলাইট চিত্রেও স্পষ্ট ধরা পড়ছে।
সম্প্রতি নাসা এবং ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার যৌথ গবেষণায় প্রকাশিত নতুন স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, মেক্সিকো সিটির কিছু অংশ বছরে প্রায় ১০ ইঞ্চি বা প্রায় ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত নিচে বসে যাচ্ছে। বিশ্বের বড় শহরগুলোর মধ্যে এটি বর্তমানে সবচেয়ে দ্রুতগতির ভূমি ধসের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষের বসবাস এই বিশাল শহরে। কয়েক হাজার বর্গমাইল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত মেক্সিকো সিটির অনেক অংশেই ভূমি ধস এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কিছু এলাকায় প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২ সেন্টিমিটার করে মাটি নিচে নেমে যাচ্ছে। এই ধসের প্রভাব পড়ছে শহরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, রাস্তাঘাট, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, মেট্রোরেল, আবাসন প্রকল্প এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর ওপর।
মেক্সিকোর ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভার্সিটির ভূ-ভৌত গবেষক এনরিকো ক্যাব্রাল জানিয়েছেন, সামগ্রিকভাবে শহরের কিছু অংশ বছরে প্রায় ২৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত নিচে বসছে। তার মতে, এটি শুধু একটি ভৌগোলিক সমস্যা নয়, বরং এটি ভবিষ্যতে মানববসতি ও নগর পরিকল্পনার জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, গত এক শতাব্দীরও কম সময়ে শহরের কিছু অংশ প্রায় ৩৯ ফুট বা ১২ মিটার পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। এর ফলে বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা হেলে পড়েছে বা কাঠামোগত ঝুঁকিতে পড়েছে। ১৫৭৩ সালে নির্মাণ শুরু হওয়া ঐতিহাসিক মেট্রোপলিটন ক্যাথেড্রাল এখন দৃশ্যমানভাবে একদিকে হেলে গেছে। শহরের পুরোনো অনেক ভবনের চারপাশে মাটি নিচে বসে যাওয়ায় নতুন করে সিঁড়ি নির্মাণ করতে হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধসের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ইতোমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও রাস্তা ফেটে যাচ্ছে, পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং পানির সরবরাহে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়ছে।
এই ভয়াবহ পরিবর্তনের তথ্য এসেছে অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে। নাসা ও ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার যৌথ স্যাটেলাইট ব্যবস্থা রাডার প্রযুক্তি ব্যবহার করে পৃথিবীর পৃষ্ঠের ক্ষুদ্র পরিবর্তনও নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে পারে। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা মেক্সিকো সিটির ভূমি ধসের বর্তমান চিত্র তুলে ধরেছেন।
নাসার তৈরি মানচিত্রে গাঢ় নীল রঙ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে সেইসব এলাকা, যেখানে প্রতি মাসে আধা ইঞ্চিরও বেশি হারে ভূমি নিচে বসছে। বিজ্ঞানী পল রোজেন বলেছেন, এই চিত্র দেখে সহজেই বোঝা যায় সমস্যাটি কতটা বড় এবং এটি কত দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।
প্রকল্প ব্যবস্থাপক ডেভিড বেকেয়ার্ট বলেন, মেক্সিকো সিটি দীর্ঘদিন ধরেই ভূমি ধসের জন্য পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট তথ্য দেখাচ্ছে, পরিস্থিতি আগের ধারণার চেয়েও গুরুতর।
কেন ডুবে যাচ্ছে এই বিশাল শহর—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় মেক্সিকো সিটির ইতিহাসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরটি মূলত একটি প্রাচীন হ্রদের ওপর গড়ে উঠেছে। একসময় এই অঞ্চলের বড় অংশজুড়ে ছিল জলাভূমি ও খাল। ফলে এখানকার মাটি স্বাভাবিকভাবেই নরম এবং সংকোচনশীল।
তবে প্রকৃতির চেয়েও বড় ভূমিকা রাখছে মানুষের কর্মকাণ্ড। দীর্ঘদিন ধরে শহরের ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত পরিমাণে উত্তোলন করা হচ্ছে। পানীয় জল, শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য অব্যাহতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি তোলার ফলে নিচের কাদামাটির স্তর সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। আর এই সংকোচনের কারণেই ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাচ্ছে পুরো শহর।
এর পাশাপাশি দ্রুত নগরায়ণ, উঁচু ভবন নির্মাণ এবং ভারী অবকাঠামো তৈরির চাপও মাটির ওপর অতিরিক্ত বোঝা সৃষ্টি করছে। ফলে ভূমি ধসের গতি আরও বেড়ে যাচ্ছে।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮০০ সালের শেষদিকে বছরে প্রায় ২ ইঞ্চি হারে মাটি নিচে নামত। কিন্তু ১৯৫০ সালের মধ্যে সেই হার বেড়ে দাঁড়ায় বছরে প্রায় ১৮ ইঞ্চিতে। বর্তমানে কিছু এলাকায় ধসের গতি কিছুটা কমলেও সামগ্রিক ক্ষতির মাত্রা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে মেক্সিকো সিটির অবকাঠামো ও জনজীবনে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, উন্নত নগর পরিকল্পনা এবং টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
সব মিলিয়ে মেক্সিকো সিটির এই নীরব ডুবে যাওয়া শুধু একটি শহরের সংকট নয়, বরং এটি বিশ্বের বড় শহরগুলোর জন্যও একটি সতর্কবার্তা। দ্রুত নগরায়ণ, অতিরিক্ত প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা কীভাবে একটি শহরকে ধীরে ধীরে বিপদের দিকে ঠেলে দিতে পারে, মেক্সিকো সিটি এখন তারই বাস্তব উদাহরণ।