প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া ও জাপান। দুই দেশ জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একটি বড় দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে পৌঁছেছে, যা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মহলে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরায় অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। বৈঠকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, সরবরাহ শৃঙ্খল সংকট এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে। এই অবস্থায় নিজেদের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে এবং ভবিষ্যৎ ধাক্কা মোকাবিলায় জ্বালানি খাতে নির্ভরযোগ্য অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। তিনি আরও বলেন, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের মধ্যে দীর্ঘদিনের আস্থার সম্পর্ক রয়েছে, যা এই নতুন চুক্তির মাধ্যমে আরও শক্তিশালী হবে।
অন্যদিকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেন, হরমুজ প্রণালীর বর্তমান পরিস্থিতি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে তেল ও জ্বালানি পরিবহন সীমিত হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তিনি জানান, এমন পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে দ্রুত ও সমন্বিত যোগাযোগ বজায় রাখা এখন সময়ের দাবি।
জাপান বর্তমানে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির অন্যতম বৃহৎ আমদানিকারক দেশ, আর অস্ট্রেলিয়া এই খাতে বিশ্বের শীর্ষ রপ্তানিকারকদের মধ্যে একটি। এই চুক্তির মাধ্যমে জাপানের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও নিশ্চিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার জন্যও এটি দীর্ঘমেয়াদী বাজার স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানির একটি অংশ জাপান থেকে আসে, যা দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে আরও গভীর করেছে। এই চুক্তি সেই নির্ভরশীলতাকে একটি কাঠামোবদ্ধ ও দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতায় রূপান্তরিত করবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
বৈঠকে উভয় দেশ শুধু জ্বালানি নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রেও যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে একমত হয়েছে। বৈদ্যুতিক যানবাহন, ব্যাটারি প্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে প্রয়োজনীয় খনিজ সরবরাহ নিশ্চিত করতে দুই দেশ ভবিষ্যতে যৌথ বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বিনিময় বাড়াবে বলে জানা গেছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো, যেগুলো এই পথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তারা সরাসরি প্রভাবিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়া-জাপান চুক্তি শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, বরং পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জ্বালানি স্থিতিশীলতার জন্য একটি কৌশলগত বার্তা। এটি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিকল্প অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার দিকেও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও মনে করছেন, এই চুক্তি ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ প্রযুক্তি এবং হাইড্রোজেন জ্বালানি খাতে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে শুধু জ্বালানি নিরাপত্তাই নয়, পরিবেশবান্ধব অর্থনীতির দিকেও একটি বড় অগ্রগতি হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনা, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের এই নতুন চুক্তি কেবল অর্থনৈতিক সহযোগিতা নয়, বরং একটি কৌশলগত ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি ভবিষ্যতের বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।