প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের অলংকার বাজারে আবারও বড় ধরনের দামের পরিবর্তন এসেছে। একদিকে যখন স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, অন্যদিকে টানা ওঠানামার পর রুপার দামও নতুন করে সমন্বয় করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব, ডলারের বিনিময় হার ও স্থানীয় তেজাবি ধাতুর দামের ওঠানামাকে কেন্দ্র করে এই পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত নতুন করে হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
বাজুসের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের এক ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ৬৫৭ টাকা। আগের তুলনায় প্রতি ভরিতে ১৭৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে ২১ ক্যারেটের রুপার দাম ভরিতে ৫ হাজার ৩৬৫ টাকা, ১৮ ক্যারেটের দাম ৪ হাজার ৬০৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপার দাম ৩ হাজার ৪৪১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন এই মূল্য আজ সকাল ১০টা থেকে সারাদেশে কার্যকর হয়েছে।
বাজুসের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি রুপার (পিওর সিলভার) দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে। সেই বাস্তবতায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে নতুন দর সমন্বয় করা হয়েছে। সংগঠনটির মতে, বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা এবং আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তনও স্থানীয় বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে, রুপার দামের পাশাপাশি স্বর্ণের বাজারেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সর্বশেষ সমন্বয়ে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ভরিতে ২ হাজার ১৫৮ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৪২ হাজার ৪৯৫ টাকা। এটি দেশের ইতিহাসে অন্যতম উচ্চ দামের মধ্যে একটি। পাশাপাশি ২১ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৭২ টাকা, ১৮ ক্যারেট ১ লাখ ৯৮ হাজার ৪০৫ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৬১ হাজার ৬০৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক স্বর্ণের দামের ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মানের চাপ এই দামের বৃদ্ধির প্রধান কারণ। পাশাপাশি বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, মুদ্রাস্ফীতি এবং বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বেড়ে যাওয়াও দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
দেশের জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রায় প্রতিনিয়ত দামের পরিবর্তনের কারণে ব্যবসায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। একদিকে ক্রেতারা উচ্চ দামের কারণে স্বর্ণ ও রুপা কেনায় আগ্রহ হারাচ্ছেন, অন্যদিকে দোকান মালিকদেরও স্টক ম্যানেজমেন্টে সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে বিয়ের মৌসুমে এই দামের ওঠানামা সাধারণ মানুষের বাজেটে বড় চাপ তৈরি করছে।
একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী জানান, বাজারে এখন ক্রেতার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। অনেকেই আগের মতো গহনা কিনছেন না, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প পরিমাণে কিনছেন। আবার অনেকে বিকল্প হিসেবে সনাতন বা কম ক্যারেটের গহনার দিকে ঝুঁকছেন।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, স্বর্ণ ও রুপার দাম শুধু একটি পণ্যের বাজার নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবেও কাজ করে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারের গভীর সংযোগ রয়েছে। তাই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে এই ধরনের দামের ওঠানামা ভবিষ্যতেও চলতে পারে।
বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত স্বর্ণের দাম ৬২ বার সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪ বার দাম বেড়েছে এবং ২৮ বার কমেছে। গত বছরও একই ধরনের অস্থিরতা দেখা গেছে, যেখানে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। রুপার ক্ষেত্রেও চলতি বছরে ৩৭ দফা সমন্বয় হয়েছে, যার মধ্যে অধিকাংশ সময়ই দাম ওঠানামার মধ্যেই ছিল।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এত ঘন ঘন দামের পরিবর্তন সাধারণ বাজার ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক নয়। এতে ভোক্তা আস্থা কমে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে বাজার স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ সীমিত হওয়ায় স্থানীয়ভাবে এই প্রভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
সাধারণ ক্রেতাদের অনেকেই বলছেন, স্বর্ণ এখন আর আগের মতো সহজলভ্য নেই। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বিয়ের গহনা কেনা বড় একটি আর্থিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। অনেকেই এখন স্বর্ণের পরিবর্তে বিকল্প ধাতু বা হালকা ডিজাইনের গহনার দিকে ঝুঁকছেন।
সব মিলিয়ে দেশের স্বর্ণ ও রুপার বাজারে আবারও এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দাম বাড়ার এই প্রবণতা কতদিন অব্যাহত থাকবে, তা নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। তবে আপাতত ক্রেতা ও ব্যবসায়ী উভয়কেই নতুন দামের বাস্তবতায় নিজেদের পরিকল্পনা পুনর্গঠন করতে হচ্ছে।