প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ভ্যাট আরোপের কোনো সুযোগ নেই এবং ভবিষ্যতেও এ খাতে কোনো ধরনের ভ্যাট আরোপ করা হবে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, উচ্চশিক্ষা খাতকে করের আওতায় আনা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয় এবং সরকার এ বিষয়ে নিজেদের পূর্বের অবস্থানেই অটল রয়েছে।
মঙ্গলবার (৫ মে) রাতে রাজধানীতে আয়োজিত ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা ও করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং নীতিনির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন।
ড. মাহদী আমিন বলেন, অতীতের সময়ে কিছু সিদ্ধান্তের কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ভ্যাট আরোপ করা হয়েছিল, যা তিনি “ফ্যাসিবাদী সরকারের সিদ্ধান্ত” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, তার রাজনৈতিক দল শুরু থেকেই এ ধরনের কর আরোপের বিরোধিতা করে আসছে। তার ভাষায়, উচ্চশিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ভ্যাট থাকা উচিত নয়, কারণ এটি শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে।
তিনি আরও বলেন, উচ্চশিক্ষা কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়, বরং এটি একটি সামাজিক বিনিয়োগ। তাই এ খাতে কর আরোপ শিক্ষার প্রসারে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। সরকার বর্তমানে সেই অবস্থানেই রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ভ্যাট আরোপের কোনো পরিকল্পনা নেই।
আলোচনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়। সেই সময় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিসহ একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। তিনি উল্লেখ করেন, সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কারণে বিএনপি সরকারের সময় থেকেই এ খাতে একটি ইতিবাচক নীতি সহায়তা বা “পলিসি সাপোর্ট” বিদ্যমান ছিল।
ড. মাহদী আমিন বলেন, দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে এবং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তি, ব্যবসা প্রশাসন এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তার মতে, এসব অবদান দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে এবং ভবিষ্যতেও এই অংশগ্রহণ অব্যাহত থাকবে।
শিক্ষার মান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশেই সব বিশ্ববিদ্যালয় একই মানের হয় না। বাংলাদেশেও কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন প্রয়োজন রয়েছে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলকে আরও শক্তিশালী করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি মনে করেন, এসব প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে কাজ করলে শিক্ষার মান আরও উন্নত হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার এখন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। কোনো ধরনের বৈষম্য না রেখে সব বিশ্ববিদ্যালয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়ার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এতে করে দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আলোচনায় তিনি শিল্প ও শিক্ষাখাতের সংযোগের ঘাটতির বিষয়েও কথা বলেন। তার মতে, দেশে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্ক থাকলেও সেগুলোর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কার্যকর সংযোগ গড়ে ওঠেনি। এতে শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ সীমিত হচ্ছে।
তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে সংযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এই সংযোগ শক্তিশালী হলে শিক্ষার্থীরা আরও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা লাভ করতে পারবে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও অবদান রাখতে পারবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির চেয়ারম্যান ড. মো. সবুর খান। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী এ এন এম এহসানুল হক মিলন। এছাড়া ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও শিক্ষাবিদরা উপস্থিত ছিলেন।
সব মিলিয়ে আলোচনা সভাটি দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং নীতিগত দিক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ভ্যাট ইস্যুতে সরকারের স্পষ্ট অবস্থান শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়েছে।