কোরবানি ও আকিকা একই পশুতে আদায় কি জায়েজ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৬ মে, ২০২৬
  • ১ বার
কোরবানি ও আকিকা একই পশুতে আদায় কি জায়েজ

প্রকাশ: ৬ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ ইবাদত হলো কোরবানি, যা ঈদুল আজহার সময় মুসলমানদের ওপর নির্ধারিত একটি বিশেষ ইবাদত হিসেবে পালিত হয়। এই ইবাদতের মধ্যে রয়েছে আত্মত্যাগ, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য এবং ত্যাগের ঐতিহাসিক শিক্ষা, যা শুরু হয়েছিল হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের সময় থেকে। পরবর্তীতে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তার পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর মহান আত্মত্যাগ কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত।

প্রতি বছর ঈদুল আজহার দিনে সামর্থ্যবান মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করে থাকেন। এটি ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব ইবাদত হিসেবে বিবেচিত। তবে সমাজে অনেক সময় একটি প্রশ্ন দেখা যায়, কোরবানির পশুর সঙ্গে আকিকা একত্রে আদায় করা যাবে কি না। বিশেষ করে কেউ কেউ কোরবানির পশুর অংশের সঙ্গে সন্তানের আকিকা যুক্ত করেন, যা নিয়ে ধর্মীয় বিধান সম্পর্কে কৌতূহল তৈরি হয়।

ইসলামি শরিয়তের আলোকে আলেমরা স্পষ্ট করেছেন যে, কোরবানি ও আকিকা একসঙ্গে একই পশুতে আদায় করা বৈধ। বিশেষ করে গরু, মহিষ ও উটের মতো বড় পশুর ক্ষেত্রে একাধিক শরিক গ্রহণযোগ্য, যেখানে সর্বোচ্চ সাতজন পর্যন্ত অংশ নিতে পারেন। এই সাত ভাগের মধ্যে কোরবানি ও আকিকার নিয়ত একত্রে করা যেতে পারে, যদি প্রত্যেক অংশীদারের অংশ সমান থাকে এবং নিয়ত আলাদা আলাদা হয়।

ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, উট, গরু ও মহিষে সাত ভাগ পর্যন্ত শরিকানা বৈধ, যা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এই শরিকানার ক্ষেত্রে শর্ত হলো, কোনো অংশ অন্য অংশের তুলনায় কম বা বেশি হতে পারবে না। অর্থাৎ প্রত্যেক অংশীদারের অংশ সমান হতে হবে। যদি কারও অংশ কম-বেশি হয়, তাহলে কোরবানি বা আকিকা শুদ্ধ হবে না বলে ফিকহের কিতাবগুলোতে উল্লেখ রয়েছে।

আলেমদের মতে, কোরবানির পশুতে আকিকা দেওয়া বৈধ এবং এতে কোরবানি ও আকিকা উভয়ই আদায় হয়ে যায়। ছেলের ক্ষেত্রে সাধারণত দুই ভাগ এবং মেয়ের ক্ষেত্রে এক ভাগ আকিকা করা সুন্নত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিষয়ে বিভিন্ন হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আমল থেকে দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যেখানে তিনি তাঁর নাতি হাসান ও হুসাইনের পক্ষ থেকে আকিকা করেছেন।

আকিকা ইসলামে একটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা ইবাদত হিসেবে বিবেচিত। এটি নবজাতকের পক্ষ থেকে আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের একটি মাধ্যম। শিশুর জন্মের সপ্তম দিনে আকিকা করা উত্তম বলে হাদিসে নির্দেশনা রয়েছে। যদি সপ্তম দিনে সম্ভব না হয়, তাহলে চতুর্দশ বা একুশতম দিনেও তা আদায় করা যেতে পারে। এমনকি পরবর্তী যেকোনো সময়ও আকিকা আদায় করা বৈধ বলে আলেমরা মত দিয়েছেন।

ফিকহবিদদের মতে, কোরবানির পশুর সঙ্গে আকিকা যুক্ত করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই, যদি নিয়ত সঠিক হয় এবং শরিয়তের শর্ত পূরণ করা হয়। যেমনভাবে কোরবানি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়, তেমনি আকিকাও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়। তাই একই পশুতে উভয় ইবাদত সম্পন্ন করা শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য।

এ বিষয়ে ফাতাওয়ার কিতাবাদিতে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। বিশেষ করে রদ্দুল মুহতার, হাশিয়াতুত তাহতাবি এবং অন্যান্য ফিকহ গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, কোরবানির সঙ্গে আকিকা একত্রে করা বৈধ এবং এতে কোনো শরয়ি নিষেধ নেই। বরং এটি সহজতার একটি দিক, যা অনেক পরিবার একত্রে পালন করে থাকে।

আকিকার গোশত ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ইসলাম স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। আকিকার গোশত পরিবারের সদস্যরা খেতে পারে, অন্যদের খাওয়াতে পারে এবং কিছু অংশ দানও করতে পারে। তবে এর কোনো অংশ বিক্রি করা বা পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া শরিয়তে অনুমোদিত নয়। একই নিয়ম কোরবানির পশুর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

ইসলামি বিশেষজ্ঞরা বলেন, আকিকা শুধু একটি সামাজিক প্রথা নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ইবাদত, যা সন্তানের জন্মের পর আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এটি পরিবারে আনন্দের পাশাপাশি দান-সদকার একটি সুন্দর দিকও তুলে ধরে।

বর্তমান সময়ে অনেক পরিবারই অর্থনৈতিক কারণে কোরবানির পশুর সঙ্গে আকিকা একত্রে আদায় করে থাকে। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বৈধ হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে বিভ্রান্তির প্রয়োজন নেই। তবে শর্ত হলো, নিয়ত বিশুদ্ধ হতে হবে এবং শরিয়তের নির্ধারিত নিয়ম যথাযথভাবে পালন করতে হবে।

সব মিলিয়ে ইসলামি ফিকহের আলোকে স্পষ্ট যে, কোরবানি ও আকিকা একসঙ্গে একই পশুতে আদায় করা বৈধ এবং এতে কোনো শরয়ি বাধা নেই। বরং এটি একটি সহজ ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি, যা সামর্থ্যবান মুসলমানরা চাইলে পালন করতে পারেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত