প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ঘিরে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে বড় ধরনের একটি তথ্য সামনে এসেছে। জাপানের শিপিং কোম্পানি মিতসুই ওএসকে লাইনস (এমওএল) জানিয়েছে, তাদের তিনটি জাহাজ গত এপ্রিল মাসে পারস্য উপসাগর অতিক্রম করলেও কোনো ধরনের ট্রানজিট ফি বা টোল প্রদান করতে হয়নি।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স, যারা শুক্রবার এমওএল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে এই তথ্য সংগ্রহ করে।
কোম্পানিটির বক্তব্য অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহে তাদের তিনটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়ে নিরাপদে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বের হয়ে আসে। তবে চলাচলের সময় কোনো পক্ষই তাদের কাছ থেকে টোল বা অতিরিক্ত কোনো ফি আদায় করেনি। বিষয়টি আন্তর্জাতিক শিপিং খাতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইরান-সংক্রান্ত ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তেহরান পক্ষ থেকে আগেই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর বিশেষ টোল আরোপ করা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা ও সংঘাতের প্রেক্ষিতে এই প্রস্তাবকে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছিল।
তবে জাপানি শিপিং কোম্পানির একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় এমন কোনো টোল বা ফি প্রদানের বিষয় অন্তর্ভুক্ত নেই। তিনি বলেন, কোম্পানি সবসময় তাদের জাহাজ, ক্রু এবং পণ্যের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে।
এমওএল আরও জানিয়েছে, কীভাবে তাদের জাহাজগুলো টোল ছাড়াই এই সংবেদনশীল জলপথ অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে, সে বিষয়ে তারা সংশ্লিষ্ট দেশ ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সমন্বিত প্রচেষ্টাকে কৃতিত্ব দিচ্ছে। তাদের মতে, আঞ্চলিক সহযোগিতা থাকলে এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চলাচল তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকে।
বর্তমানে পারস্য উপসাগরে কোম্পানিটির আরও কয়েকটি জাহাজ অবস্থান করছে এবং সেগুলোর চলাচল পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
জাপানি কোম্পানিটির অধীনে থাকা ভারতীয় পতাকাবাহী দুটি এলপিজি পরিবহনকারী জাহাজও সম্প্রতি একই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বলে জানা গেছে। এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এলপিজি ও অপরিশোধিত তেলের মতো জ্বালানি পণ্যের পরিবহন এই রুটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র পরিবহন বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেল ও এলপিজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। ফলে এই রুটটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণও।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামরিক উত্তেজনা সরাসরি বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে এখানে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এমওএল-এর সাম্প্রতিক এই ঘোষণা এমন এক সময় এসেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরাইলকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কোনো অতিরিক্ত টোল বা বাধা ছাড়াই জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকা কিছুটা স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি যে কোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে। তাই শিপিং কোম্পানিগুলোকে বিকল্প পরিকল্পনা এবং বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
জাপানি কোম্পানিটি স্পষ্ট করেছে, তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে নিরাপদে পণ্য পরিবহন নিশ্চিত করা এবং কোনো ধরনের ঝুঁকি এড়িয়ে চলা।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিতে টোল ছাড়াই জাপানি জাহাজ পার হওয়ার এই ঘটনা বৈশ্বিক শিপিং খাতে সাময়িক স্বস্তি দিলেও, অঞ্চলটির সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগের বাইরে নয়।