প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় সংসদে সংশোধনীসহ অর্থবিল-২০২৬ পাস হয়েছে। নতুন অর্থবিলে সাধারণ করদাতাদের স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়েছে, পাশাপাশি বিতর্কিত কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক হিসাব খোলা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করহার, দেশীয় শিল্পে শুল্ক সুবিধা এবং বিভিন্ন খাতে কর কাঠামোয় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে অর্থবিলটি পাস হয়। এর আগে বাজেট প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণের পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সংসদে এসব সংশোধনী গ্রহণের পর চূড়ান্তভাবে অর্থবিল-২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়।
পাস হওয়া অর্থবিলে সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনগুলোর একটি হলো কালোটাকা সাদা করার সুযোগ প্রত্যাহার। বাজেট প্রস্তাবে থাকা এ ধরনের বিধান নিয়ে জনমনে যে বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তা বিবেচনায় নিয়ে সরকার শেষ পর্যন্ত এই সুযোগ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এতে কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর বার্তা দেওয়া হয়েছে।
নতুন অর্থবিলে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকা সাধারণ চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও অন্যান্য আয়ের মানুষের ওপর করের চাপ কিছুটা কমবে। সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা থাকবে ৪ লাখ টাকা। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে তা বাড়িয়ে ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৫ লাখ টাকা করার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
এর আগে প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা তুলনামূলক কম রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সংশোধনীতে এ সীমা বাড়ানো হয়েছে।
অর্থবিলে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বা কর শনাক্তকরণ নম্বর বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও শিথিল করা হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, এ বিষয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ায় এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে বেশির ভাগ ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক টিআইএন শর্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে। একইভাবে বণ্টন দলিল ও নামজারি নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব বাতিল করা হয়েছে।
বেসরকারি উচ্চশিক্ষা খাতেও এসেছে পরিবর্তন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপিত আয়কর হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে এবং উচ্চশিক্ষার ব্যয় ও ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে জানান, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও করদাতাবান্ধব করা। তিনি বলেন, কৃষি, শিল্প, সেবা খাত, রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশোধিত অর্থবিলে দেশীয় শিল্পকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন খাতে শুল্ক সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক কমানো হয়েছে এবং উৎপাদন খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বেশ কিছু কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ওষুধ ও অন্যান্য শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল, পিভিসি ও পিইটি রেজিনসহ বিভিন্ন উপকরণের ওপর শুল্ক কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
কৃষি ও মৎস্য খাতেও সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চিংড়ি শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমাতে খাদ্য, প্রোবায়োটিক, ভিটামিন, খনিজ উপাদান ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ওপর বিভিন্ন শুল্ক ও কর সুবিধার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি মাছ সরবরাহের ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে নতুন অর্থবিলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সার্চ ইঞ্জিন, অনলাইন মার্কেটপ্লেসসহ ডিজিটাল মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের আশা, এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক অর্থপ্রদানের প্রবণতা বাড়বে এবং ডিজিটাল ব্যবসা খাতে স্বচ্ছতা তৈরি হবে।
দেশীয় মোটরগাড়ি শিল্পকে উৎসাহ দিতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডাবল কেবিন পিকআপ ও মাইক্রোবাসের ওপর ভ্যাট কমানোর প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এলইডি বাতি ও প্রিফ্যাব্রিকেটেড ভবনের কাঁচামালের শুল্ক সুবিধার মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, বিনিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের প্রস্তাবও প্রত্যাহার করা হয়েছে। জমির প্রকৃত বাজারমূল্য ও নিবন্ধনমূল্যের পার্থক্যজনিত জটিলতা কমানোর উদ্দেশ্যে প্রস্তাবটি আনা হলেও জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ায় তা বাতিল করা হয়েছে।
৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক ব্যয়ের এই বাজেট আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। সরকারের দাবি, সংশোধিত অর্থবিলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের করভার কমানো, শিল্প ও বিনিয়োগে গতি আনা এবং অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য পূরণে নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি হবে।
অর্থবিল-২০২৬ পাসের মধ্য দিয়ে সরকার একদিকে কর ব্যবস্থায় সংস্কারের বার্তা দিয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ করদাতা ও উৎপাদনমুখী খাতকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এখন বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসব সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিই হবে মূল পর্যবেক্ষণের বিষয়।