যুক্তরাষ্ট্রে চীনা ব্যবসায়ীর ৩০ বছরের সাজা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬
  • ৭ বার
যুক্তরাষ্ট্রে চীনা ব্যবসায়ীর ৩০ বছরের সাজা

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চীনের একসময়কার আলোচিত ধনী ব্যবসায়ী গুও ওয়েনগুইকে আর্থিক জালিয়াতির দায়ে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত। নিউইয়র্কের ম্যানহাটান ফেডারেল আদালত সোমবার (২৯ জুন) দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে তার বিরুদ্ধে এই সাজা ঘোষণা করেন।

আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, গুও ওয়েনগুই বিভিন্ন প্রতারণামূলক বিনিয়োগ প্রকল্পের মাধ্যমে হাজারো মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। বিচারকের মতে, তিনি চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) কঠোর সমালোচক হিসেবে নিজের একটি রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করে সেই আবেগকে ব্যবহার করেছেন এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন।

গুওর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ২০১৮ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি তার নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও মিডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে মানুষকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করেন। এসব বিনিয়োগ প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ করেন বলে আদালতে উপস্থাপিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

মার্কিন প্রসিকিউটরদের দাবি, সংগৃহীত অর্থের বড় একটি অংশ ব্যক্তিগত বিলাসী জীবনযাপনে ব্যয় করেন গুও। নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কের কাছে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট কেনা, ব্যক্তিগত ইয়ট, বিলাসবহুল গাড়ি, রেস কার এবং দামি পোশাকসহ নানা ক্ষেত্রে তিনি এই অর্থ ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ করা হয়।

সাজার আদেশ দেওয়ার সময় ম্যানহাটান ফেডারেল বিচারক অ্যানালিসা টরেস বলেন, গুও মূলত চীনা সরকারের সমালোচক ও গণতন্ত্রপন্থী মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। তিনি ভুক্তভোগীদের ক্ষতির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন বলে জানান।

বিচারক সাজা ঘোষণার সময় কয়েকজন ভুক্তভোগীর লেখা চিঠিও আদালতে পড়ে শোনান। এসব চিঠিতে অনেকে জানিয়েছেন, তারা তাদের জীবনের সঞ্চয় হারিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি এই ঘটনার কারণে তাদের পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে।

আদালত গুও ওয়েনগুইকে ৮৮৯ মিলিয়ন ডলার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই অর্থ ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ ও আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হবে।

চীনে ব্যবসায়ী হিসেবে উত্থানের পর গুও ওয়েনগুই একসময় দেশটির অন্যতম পরিচিত ধনী ব্যক্তি ছিলেন। তবে পরে তিনি চীন ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং সেখান থেকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে শুরু করেন।

যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের পর তিনি দেশটির রাজনৈতিক মহলের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফ্লোরিডার গলফ ক্লাবের সদস্য ছিলেন এবং ট্রাম্পের সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যাননের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন।

গুও নিজেকে চীনা সরকারের নিপীড়নের শিকার বলে দাবি করে আসছেন। আদালতে তিনি বলেন, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণেই তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তার আইনজীবীরা দাবি করেন, গুও মূলত রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার এবং চীনে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল।

তবে সাত সপ্তাহ ধরে চলা বিচার শেষে ১২টি ফৌজদারি অভিযোগের মধ্যে ৯টিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন বিচারকরা। প্রসিকিউটরদের বক্তব্য ছিল, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে গুও সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেন এবং সেই আস্থাকে কাজে লাগিয়ে বড় ধরনের আর্থিক প্রতারণা চালান।

সাজা ঘোষণার দিন আদালতে হাজির হওয়ার সময় গুওর শারীরিক অবস্থা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। প্রসিকিউটররা অভিযোগ করেন, তিনি অসুস্থতার ভান করছেন। তবে গুও এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। দোভাষীর মাধ্যমে তিনি আদালতকে জানান, কারাগারে তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয়েছে এবং আদালতে আনার পথে তিনি কয়েকবার বমি করেছেন।

আদালতের বাইরে গুওর কিছু সমর্থক উপস্থিত ছিলেন। রায় ঘোষণার পর তিনি বেরিয়ে আসার সময় তারা তাকে করতালি দিয়ে স্বাগত জানান। এতে বোঝা যায়, তার প্রতি এখনো কিছু মানুষের সমর্থন রয়েছে, বিশেষ করে যারা তাকে চীনা সরকারের সমালোচক হিসেবে দেখেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের দৃষ্টিতে গুওর মামলা মূলত একটি বড় ধরনের আর্থিক প্রতারণার ঘটনা। কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক বক্তব্য বা পরিচয়ের আড়ালে বিনিয়োগকারীদের প্রতারণা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গুও ওয়েনগুইয়ের এই সাজা শুধু একটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নয়, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক অপরাধ, বিনিয়োগ প্রতারণা এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গুওর উত্থান ও পতনের ঘটনা দেখিয়েছে, রাজনৈতিক পরিচিতি, সামাজিক প্রভাব কিংবা জনসমর্থন থাকলেও আর্থিক স্বচ্ছতা ও আইনি জবাবদিহিতা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের এই রায় এখন আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগ ব্যবস্থায় সতর্কতার একটি বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত