প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ইউরোপে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলছে এক ভয়ংকর মানবপাচার চক্র। জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় তথ্যসূত্র এবং দেশের অভ্যন্তরীণ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশিদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি প্রবেশের যাত্রাপথ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই লিবিয়া হয়ে অন্তত ৯ হাজার ৭৩৫ জন বাংলাদেশি ইতালি পৌঁছেছেন। এই পথে যাত্রা করার সময় অনেকেই বন্দি, নির্যাতিত বা নিখোঁজ হয়েছেন, এমনকি প্রাণও দিয়েছেন।
লিবিয়ার ক্যাম্পগুলোতে বাংলাদেশি যুবকদের আটকে রেখে ভয়ংকর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ। এসব টাকার দাবিতে দেশে থাকা পরিবারের ওপর চাপ বাড়ানো হয়। অর্থ দিলেও অনেক ক্ষেত্রে বন্ধুরা ফিরে আসে না। শুধু ২০২5 সালেই লিবিয়ার জঙ্গলে পাওয়া গেছে ২৩ জন গলিত বাংলাদেশির লাশ—যারা ইউরোপ যাওয়ার আশায় নৌযানে যাত্রা করেছিল।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের সায়াদ হোসেন সাজু ছিলেন তেমনই এক ভাগ্যপরীক্ষায় যাওয়া তরুণ। গত বছরের জুলাইয়ে ১৫ লাখ টাকা দিয়ে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে লিবিয়া যান তিনি। নভেম্বরের ২১ তারিখে বোটে ওঠার কথা জানিয়ে মায়ের কাছে পাঠানো শেষ ভয়েস মেসেজের পর থেকেই তার আর কোনো খোঁজ মেলেনি। ছেলের শোকে চোখের জ্যোতি হারাতে বসেছেন মা জাহানারা বেগম।
এমন একেকটি গল্প শুধুই একেকটি পরিবার নয়, গোটা দেশের মানবিক চিত্রকেই গভীর সংকটে ফেলছে।ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্যমতে, ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী তরুণরাই সবচেয়ে বেশি এই অনিয়মিত পথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ দেশের অন্তত এক ডজন জেলায় এই প্রবণতা ভয়ংকরভাবে বাড়ছে। দালালরা এখন ফেসবুক ও অনলাইন গ্রুপ ব্যবহার করে ফাঁদ পেতে রাখছে। ভুক্তভোগীরা দেশে ফিরে মামলা করলেও মূল হোতারা রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে, শুধু ২০২৪ সালেই মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে নতুন করে ১,০৩৪টি মামলা হয়েছে। এর বাইরে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার হাজার মামলা ঝুলে আছে, যার মধ্যে তিন হাজারের বেশি মামলা এখনো বিচারাধীন। তদন্ত শেষ হয়নি আরও হাজারের ওপর মামলার।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ইউরোপে বাংলাদেশিদের অভিবাসনের প্রধান পথ হয়ে উঠেছে লিবিয়া। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই পথে ইউরোপে প্রবেশ করেছে অন্তত ৯২ হাজার ৪২৭ জন বাংলাদেশি। এই যাত্রাপথে অন্তত ৬৩ শতাংশ মানুষ বন্দি হয়েছেন, যাদের ৯৩ শতাংশই বন্দি শিবিরে আটকা পড়ে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। খাবারের সংকট, চলাচলে বাধা এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এসব পথে সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।তাছাড়া প্রতিনিয়ত সহজ সরল তরুণদের নানা এপ ব্যবহার করে এরা লোভনীয় অফার করে থাকে, এই চক্র দীর্ঘদিন থেকে নানানভাবে প্রতারিত করে তরুণদের হয়রানি করে থাকে। লাবিব আহমদ নামে একজন সিলেটের সৌদি প্রবাসী আমাদের সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন সোশ্যাল মিডিয়া এবং হোয়াটচ্যাপ এ উনাকে নানা নামে লিংক এর মাধ্যমে এই ব্যক্তিরা যোগাযোগ করে। তিনি যাচাইবাছাই করতে আমাদের সাহায্য নেন।
মানবপাচারের নতুন রুট হিসেবেও এখন যুক্ত হচ্ছে আরও অনেক দেশ ও কৌশল। দুবাই-লিবিয়া, দুবাই-সিরিয়া, ইস্তানবুল-কাতার কিংবা সৌদি আরব হয়ে যাত্রার পাশাপাশি সম্প্রতি যোগ হয়েছে রাশিয়া, সার্বিয়া, কম্বোডিয়া, নেপাল ও তিউনিসিয়ার মতো দেশ। বাংলাদেশ থেকে ‘অন অ্যারাইভাল ভিসা’ সুবিধা নিয়ে নেপালে পাঠিয়ে সেখান থেকেই পাচারকারীরা পরিকল্পিতভাবে তরুণদের আটকে রাখছে। এছাড়া হজ ও কনফারেন্স ভিসাও ব্যবহার হচ্ছে পাচারের হাতিয়ার হিসেবে।
বরগুনার মোকামিয়া গ্রামের সাইদুর রহমান ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে মালয়েশিয়ায় পাচারের শিকার হন। নির্যাতনের মধ্য দিয়ে ফিরে এসে তিনি মামলা করলেও পুলিশ আজও প্রধান আসামিকে গ্রেফতার করেনি। এটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং শত শত অভিযোগের মধ্যে একটি, যার বিচার কার্যত ঝুলে আছে।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, “পাচারকারীরা এখন ডিজিটাল কৌশল ও টেকনোলজি ব্যবহার করছে, কিন্তু আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সে তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে। পাচার প্রতিরোধ আইন থাকা সত্ত্বেও মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়ায় পাচারকারীদের সাহস বাড়ছে।”
এ বিষয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, “সরকার খুব ভালো করেই জানে কোন কোন রুট ব্যবহার হচ্ছে। তাই প্রথমত সীমান্ত এবং ইমিগ্রেশন পয়েন্টে নজরদারি বাড়ানো দরকার। দ্বিতীয়ত, যেসব দেশে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ যাচ্ছে, তাদের সঙ্গে যৌথ কূটনৈতিক পদক্ষেপ জরুরি।”
তিনি বলেন, “সকল মানবপাচার মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে পাচারকারীরা ভয় পায়। পাশাপাশি জনসচেতনতা, প্রযুক্তি ব্যবহার, আন্তর্জাতিক সমন্বয়—সবকিছু একসাথে এগিয়ে নিয়ে না গেলে এই স্রোত থামানো কঠিন হবে।”
বাংলাদেশের তরুণরা যেন বৈধভাবে বিদেশে গিয়ে নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন, আর কোনো মা যেন ছেলের খোঁজে চোখের জ্যোতি না হারান—এই প্রত্যাশা এখন শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং জাতীয় অগ্রাধিকারের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাচারের চক্রকে ভাঙতে হলে সরকার, সমাজ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের একসাথে উদ্যোগ নিতে হবে—এটাই সময়ের দাবি।
মানবপাচারের মামলা হলেও বিচার মিলছে না
২০২৪ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ, ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ড হয়ে পাচারের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় মাফিয়াদের হাতে তুলে দেওয়া হয় বরগুনার মোকামিয়া গ্রামের সাইদুর রহমানকে। প্রতিবেশী চাচা মাহফুজ মৃধার মাধ্যমে মানবপাচার চক্রের ফাঁদে পড়েন তিনি। পরবর্তীতে মোটা অঙ্কের টাকা এবং নির্যাতনের বিনিময়ে মুক্তি পান তিনি। সাইদুর জানান, এ নিয়ে চলতি বছরের মে মাসের ২৪ তারিখ বরগুনা মানবপাচার প্রতিরোধ দমন ট্রাইব্যুনালে দালাল মাহফুজ মৃধাসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনি। সাইদুর জানান, আদালত থেকে থানা পুলিশকে আসামি গ্রেপ্তারের কথা বললেও প্রশাসন নীরব।
মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমনে ২০১২ সালে সরকার আইন করার পর থেকে মানব পাচার আইনে নিয়মিত মামলা হলেও অধিকাংশ মামলার বিচার শেষ হচ্ছে না। আবার যেগুলোর বিচার শেষ হচ্ছে, সেখানে আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মানবপাচার মামলাসংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চার হাজার ৩৬০টি মামলা ঝুলে আছে। এরমধ্যে এক হাজার ৩৪৬টি মামলা এখনো তদন্তাধীন আর তিন হাজার ১৪টি মামলা বিচারাধীন।
মানবপাচারের নতুন রুট ও কৌশল বাড়ছে
গত এক বছরে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগামের কাছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার ও নির্যাতনের শিকার, আটকে পড়া, জেল বা ডিপুটেশন ক্যাম্পে বন্দি ৩২৭ জন ভুক্তভোগীর পরিবার সহায়তা চেয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৮১ বাংলাদেশিকে নিরাপদে ফিরিয়ে এনেছে। পাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনে কাজ করতে গিয়ে দেখা গেছে, মানবপাচারকারীরা এখন শুধু সাগরপথে নয়; ভিজিট ভিসা, কনফারেন্স ইনভাইটেশন, ওয়ার্ক পারমিট, এমনকি হজ ভিসাও ব্যবহার করছে। দুবাই-লিবিয়া হয়ে ইউরোপ আবার দুবাই-সার্বিয়া-স্লোভেনিয়া হয়ে ইতালি কিংবা সৌদি আরব হয়ে। নতুন করে যুক্ত হয়েছে রাশিয়া।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যানুযায়ী, ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে এখন বাংলাদেশিদের নেপালে নিয়ে আটকে রাখা হচ্ছে। যেহেতু নেপালে প্রবেশে ‘অন অ্যারাইভাল ভিসা’ আছে, সেক্ষেত্রে সহজে পাচারকারীরা কর্মীদের নেপালে নিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও মানবপাচারকারীরা বর্তমানে আলজেরিয়া, মৌরিতানিয়া, তিউনিসিয়া, রাশিয়া, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও সার্বিয়ার মতো দেশ ব্যবহার করছে।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, গত কয়েক বছর ধরে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার শীর্ষে বাংলাদেশিরা। এভাবে ইতালি যাওয়ার পথে অনেক প্রাণহানি ঘটে। এছাড়াও লিবিয়ায় অনেক মানুষ ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। পাচারকারীরা এখন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করছে। সে তুলনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পিছিয়ে। পাচারের মামলাগুলোর বিচারও হচ্ছে না। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
মানবচাপার ও অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা কেন থামছে না—এমন প্রশ্নে অভিবাসী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির আমার দেশকে বলেন, বাংলাদেশ সরকার ভালো করে জানে এ কাজে কোন কোন রুট ব্যবহার করা হয়। সুতরাং এ বিষয়ে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের নজরদারি জোরদার রাখতে হবে। তাছাড়া যেসব দেশে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসী হিসেবে যায়, সেসব দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক সুসম্পর্ক গড়ে তুলে মানবপাচার রোধে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, পাচারের শিকার হওয়া সব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে পারলে দালালরা ভয় পাবে। এ নিয়ে সরকারকে যথেষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন