চাঁদাবাজির ঘূর্ণিপাকে শাসনগাছা বাসস্ট্যান্ড: আওয়ামী ক্যাডার তাজুলের ছত্রছায়ায় বিএনপির নেতারাও ভাগীদার

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই, ২০২৫
  • ৪০ বার

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা।একটি বাংলাদেশ অনলাইন

কুমিল্লার শাসনগাছা বাসস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি যেন রীতিমতো একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। এই অন্ধকার রাজত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দক্ষিণ দুর্গাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কুমিল্লা মোটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক তাজুল ইসলাম। বিস্ময়কর হলেও সত্য, আওয়ামী লীগের এই শক্তিশালী নেতার ছত্রছায়ায়ই চাঁদাবাজির কোটি টাকার বাণিজ্য এখনো চালু রয়েছে, আর এই অর্থপ্রবাহের অংশ বিশেষ পকেটে যাচ্ছে বিএনপির শীর্ষ নেতাদেরও।

তাজুল ইসলাম দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে কুমিল্লা মোটর অ্যাসোসিয়েশনের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন এবং বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড, বিশেষ করে শাসনগাছায় প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকা অবৈধভাবে আদায় করছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাপিয়া, সুগন্ধা, একতা, লাব্বাইক, রয়েল, রয়েল সিলেট, রিয়েল, এশিয়াসহ একাধিক বাস কোম্পানি থেকে প্রতিটি বাসের জন্য প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার টাকা করে চাঁদা তোলা হচ্ছে। এর মধ্যে মাত্র ৫০০ টাকা ‘অফিসিয়াল জমা’ দেখানো হয়, বাকিটা ভাগ হয় রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে।

এই চাঁদাবাজির চক্রে শুধু আওয়ামী লীগই নয়, সংশ্লিষ্ট রয়েছেন বিএনপির নেতারাও। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপির নেতা রেজাউল কাইয়ুমের ছোট ভাই রাশেদ এই চাঁদা সংগ্রহের কাজে সক্রিয়। তার মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার বাস থেকে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা করে চাঁদা আদায় হয়, যার একটি বড় অংশ মাসোয়ারা হিসেবে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের কাছে পৌঁছে যায়। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপির স্থানীয় এক প্রভাবশালী নেতা মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা নেন এই কার্যক্রমকে শেল্টার দেওয়ার বিনিময়ে।

অভিযোগ অনুযায়ী, রয়েল কোচ, আগে যেটি জাঙ্গালিয়া থেকে চলত, সেটিও এখন শাসনগাছা থেকে চলছে মোটা অঙ্কের লেনদেনের পর রেজাউল কাইয়ুমের প্রত্যক্ষ ইঙ্গিতে। অনেক পরিবহন মালিক এবং চালক চাঁদা না দিলে গাড়ির চাকা ঘোরাতে পারেন না বলেও জানান। বাস মালিক তিশা প্লাস পরিবহনের রুহুল আমিন বলেন, “চাঁদা না দিলে বাস চলবে না — এমন বাস্তবতা এখন কুমিল্লায়।”

চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললেও তাজুল ইসলাম দৃঢ়ভাবে নিজের অবস্থানে থেকে গেছেন। সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেন, “সব হিসাব সমিতির মাধ্যমে হয়, ক্যাশিয়ার আছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক আছে, সমস্যা হবে না।”

এই বিষয়ে জানতে চাইলে মোটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জামিল আহমেদ খন্দকার বলেন, “তাজুল ইসলাম চাঁদাবাজি করছেন, এ বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই।”

অন্যদিকে, বিএনপির নেতাদের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক রেজাউল কাইয়ুম বলেন, “বাস মালিক সমিতির কিছু লোক ডাক এনেছে, তারা কিছু টাকা তুলে স্টাফদের বেতন দেয়। চাঁদাবাজির বিষয়টি আমার জানা নেই।”

এই পরিস্থিতি প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লা শাখার সভাপতি আলমগীর হোসেন খান বলেন, “চাঁদাবাজি রাজনীতির ছত্রছায়ায় এখনো অব্যাহত আছে। প্রশাসন চাইলেই এই অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব, কিন্তু রাজনৈতিক ব্যাকিংয়ের কারণে শ্রমিকরা চাঁদাবাজিতে সাহস পাচ্ছে। এর জেরেই সাধারণ যাত্রীরাও অতিরিক্ত ভাড়া গুনছে।”

এ প্রসঙ্গে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. নাজির আহমদ খান বলেন, “চাঁদাবাজির ব্যাপারে আমরা জিরো টলারেন্সে রয়েছি। নির্ভরযোগ্য অভিযোগ পেলে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেবো।”

জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল কায়ছার জানান, “বাসস্ট্যান্ডের ইজারা জেলা পরিষদের অধীনে। নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি আদায় হলে সেটা চাঁদাবাজির শামিল। লিখিত অভিযোগ পেলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে।”

সরকার বদলালেও শাসনগাছা বাসস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজির বাস্তবতা বদলায়নি। বরং রাজনৈতিক ছত্রছায়া বদলেছে, তবে চাঁদাবাজির কাঠামো সেই আগের মতোই দৃঢ়। এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সমাজের সক্রিয় সচেতনতা। অন্যথায় সাধারণ যাত্রীদের ভাড়া আরও বাড়বে, আর চাঁদাবাজরা থেকে যাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত