প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঈদকে সামনে রেখে বাড়ি ফেরার আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হলো শোকের মাতমে। কম ভাড়ায় দ্রুত বাড়ি পৌঁছানোর আশায় রডবোঝাই ট্রাকে চড়ে যাত্রা করেছিলেন কয়েকজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষ। কিন্তু সেই যাত্রা শেষ হয়েছে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন। নিহত ও আহতদের অধিকাংশই ছিলেন নিম্নআয়ের মানুষ, যারা জীবিকার তাগিদে দূর শহরে কাজ করতেন এবং ঈদের আগে পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরতে চেয়েছিলেন।
সোমবার ভোরে যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তের সংযোগ সড়কের সরাতৈল এলাকায় ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয় পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় লোকজন। রডের নিচে চাপা পড়ে থাকা যাত্রীদের উদ্ধার করতে গিয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের মুখোমুখি হন উদ্ধারকর্মীরা।
ঘটনায় বেঁচে যাওয়া যাত্রী তরিকুল ইসলামের কণ্ঠে তখনো আতঙ্ক আর শোকের ভার। তিনি জানান, চট্টগ্রাম থেকে কম খরচে বাড়ি ফেরার জন্য তিনি শ্যালক নজরুল ইসলাম এবং ভাগনে তুহিনকে নিয়ে রডবোঝাই ট্রাকে উঠেছিলেন। তাঁদের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায়। পরিবার অপেক্ষা করছিল ঈদের আগে প্রিয়জনদের ঘরে ফেরার জন্য। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে নজরুল ইসলামের মরদেহ এখন মর্গে, তুহিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আর তরিকুল নিজে থানায় বসে লাশ বুঝে নেওয়ার অপেক্ষা করছেন।
তরিকুল ইসলাম বলেন, পরিবারের সদস্যরা ভেবেছিলেন দুপুরের মধ্যেই তারা বাড়ি পৌঁছে যাবেন। কিন্তু এক মুহূর্তের দুর্ঘটনায় সবকিছু বদলে গেছে। তাঁর ভাষায়, “আমরা গরিব মানুষ। একটু কম ভাড়ায় বাড়ি যাওয়ার জন্য ট্রাকে উঠছিলাম। কে জানত এই যাত্রাই শেষ যাত্রা হবে।”
জানা গেছে, তরিকুল ইসলাম ও তাঁর সহযাত্রীরা চট্টগ্রামে হাঁড়িপাতিল ও তৈজসপত্রের ব্যবসা করতেন। চট্টগ্রামের অলংকার মোড় থেকে জনপ্রতি ৫০০ টাকা ভাড়ায় তাঁরা রাজশাহীর উদ্দেশে রডবোঝাই ট্রাকে ওঠেন। প্রথমে চারজন যাত্রী ছিলেন। পরে ফেনী থেকে আরও অন্তত ১৮ জন ওই ট্রাকে ওঠেন। সবাই ছিলেন শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষ, যাদের অধিকাংশই ঈদ উপলক্ষে পরিবারের কাছে ফিরছিলেন।
টাঙ্গাইল ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খোরশেদ আলম জানান, রাত গভীর হওয়ার পর সবাই ক্লান্ত হয়ে ট্রাকে বহন করা রডের ওপর ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ঢাকা পার হওয়ার পর রাস্তা অনেকটাই ফাঁকা ছিল। হঠাৎ প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে উল্টে যায়। এরপর চারদিকে শুধু আর্তনাদ আর চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। কেউ রডের নিচে চাপা পড়ে ছিলেন, কেউ ছিটকে রাস্তায় পড়ে গিয়েছিলেন।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয় মানুষ দ্রুত উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান চালান। আহতদের দ্রুত বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে অনেককে ঘটনাস্থল থেকেই মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
যমুনা সেতুর পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা Khandakar Fuad Ruhani জানান, নিহত ও আহতদের অধিকাংশই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দিনমজুর শ্রেণির মানুষ। কম খরচে গন্তব্যে পৌঁছাতে তারা মালবাহী ট্রাকে যাত্রী হিসেবে ভ্রমণ করছিলেন। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পরপরই উদ্ধার তৎপরতা শুরু করা হয় এবং নিহতদের পরিচয় শনাক্তে কাজ চলছে।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে কয়েকজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাঁদের বাড়ি নওগাঁ, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকায়। নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে এবং মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার Fouzia Habib বলেন, রডবোঝাই ট্রাকের ওপরে ত্রিপল দিয়ে যাত্রী বহন করা হচ্ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অতিরিক্ত বোঝা ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশে ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর সড়কে যাত্রীচাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এ সময় অনেক মানুষ কম খরচে বাড়ি ফিরতে ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে যাতায়াত করেন। বিশেষ করে ট্রাক, পিকআপ বা পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহনের ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। আইন অনুযায়ী এসব যানবাহনে যাত্রী বহন নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে তা কার্যকরভাবে বন্ধ করা যায় না।
সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দারিদ্র্য, অতিরিক্ত ভাড়া এবং পর্যাপ্ত গণপরিবহনের অভাব মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় বাধ্য করে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষেরা সামান্য অর্থ বাঁচানোর জন্য জীবনের ঝুঁকি নেন। কিন্তু প্রায়ই সেই সিদ্ধান্ত ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই দুর্ঘটনা আবারও দেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযান চালালেই হবে না, বরং ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে যাত্রী পরিবহন বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের জন্য নিরাপদ ও স্বল্পমূল্যের যাতায়াতব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।
টাঙ্গাইলের এই দুর্ঘটনায় বহু পরিবার এক মুহূর্তে উপার্জনক্ষম সদস্য হারিয়েছে। কারও বাবা আর ফিরবেন না, কারও ভাই কিংবা সন্তানের মৃত্যু হয়েছে বাড়ি ফেরার পথেই। ঈদের আনন্দের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর ঘরে এখন শুধু শোক আর কান্না।
সব মিলিয়ে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা শুধু কয়েকটি প্রাণহানির ঘটনা নয়, বরং এটি দেশের সড়কব্যবস্থা, নিরাপত্তা ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনসংগ্রামের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।