সিলেটে নারী ফুটবলের অগ্রযাত্রা: সংকট, সম্ভাবনা আর সাহসী পদক্ষেপের গল্প

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই, ২০২৫
  • ৪৪ বার

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

(ইসমাত আরা জাহান)

সিলেট — বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা বিভাগটি শুধু চা-বাগান, পাহাড় কিংবা পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেই পরিচিত নয়; এখানে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে এক সাহসী খেলাধুলা আন্দোলন, যার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন নারী ফুটবলাররা। কিন্তু এই পথ মোটেও মসৃণ নয়। অবহেলা, অবকাঠামোর সংকট, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও স্বল্প সুযোগের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে একদল কিশোরী ও তরুণী নিজেদের স্বপ্ন ধরে রেখেছেন শক্ত হাতে।

পিছিয়ে পড়া থেকে লড়াইয়ে ফেরা
সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার তত্ত্বাবধানে নারীদের জন্য ফুটবল কার্যক্রম থাকলেও সেটি খুবই সীমিত। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে কিছু প্রশিক্ষণ কর্মশালা এবং টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হলেও তা বছরের কয়েকটি মাত্র মাসেই সীমাবদ্ধ। অধিকাংশ সময় মাঠ থাকে পুরুষ দলের দখলে। কোচের সংকট, মানসম্পন্ন অনুশীলনের ঘাটতি ও পর্যাপ্ত খেলাধুলা সরঞ্জামের অভাব প্রকট।

সিলেট মহিলা ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় রুকাইয়া আক্তার জানান, “আমরা যারা মাঠে নামি, তাদের একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়—পরিবারের অনীহা, সমাজের তাচ্ছিল্য, এমনকি খেলোয়াড় হিসেবেও পর্যাপ্ত সমর্থন না পাওয়া। তবু আমরা ছাড়িনি, কারণ আমরা জানি মাঠই আমাদের আত্মপরিচয়ের জায়গা।”

একাডেমির অভাব, বিকল্প উদ্যোগ
সিলেটে নারী ফুটবলারদের জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ একাডেমি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ অবস্থায় কিছু উৎসাহী ব্যক্তি ও স্থানীয় সংগঠন নিজেদের উদ্যোগে প্রাথমিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছেন। এমনই একটি সংগঠন ‘সিলেট স্পোর্টস একাডেমি’, যেখানে স্থানীয় কয়েকজন নারী ফুটবলারকে নিয়মিত প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। একাডেমির কোচ শামীম আহমেদ বলেন, “আমরা সীমিত সামর্থ্য নিয়ে কাজ করছি। তবে মেধাবী খেলোয়াড়ের অভাব নেই। দরকার শুধু নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পৃষ্ঠপোষকতা ও স্বীকৃতি।”

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সীমিত ভূমিকা
সিলেটের বেশিরভাগ স্কুল ও কলেজে নারীদের জন্য আলাদা ফুটবল টিম নেই। যেখানে আছে, সেখানে আবার প্রতিযোগিতার সুযোগ বা আন্তঃস্কুল ম্যাচের আয়োজন হয় খুব কম। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নারী ফুটবল নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত আগ্রহ দেখায়নি, যদিও জাতীয় পর্যায়ে অনেক সাফল্য অর্জনের পর সাম্প্রতিক সময়ে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মেয়েদের ফুটবল কার্যক্রম চালু করার কথা ভাবছে।

সম্ভাবনার ঝলক
কিছু তরুণী জাতীয় পর্যায়ের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প বা বাফুফের জুনিয়র দল পর্যন্ত গিয়েছেন। গত বছর সিলেটের গোলাপগঞ্জ থেকে উঠে আসা কিশোরী সাদিয়া খাতুন অনূর্ধ্ব-১৭ মহিলা দলের প্রাথমিক স্কোয়াডে জায়গা করে নিয়েছিলেন। তাঁর এই অর্জন স্থানীয়ভাবে উৎসাহ জাগালেও তা প্রতিষ্ঠানিকভাবে আর বিস্তার পায়নি।

অন্যদিকে, সিলেটে কয়েকটি স্কুল ও কলেজ থেকে প্রতিশ্রুতিশীল খেলোয়াড়দের জাতীয় টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। খেলোয়াড় নির্বাচন ও প্রশিক্ষণে ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহারও বাড়ছে, বিশেষ করে ভিডিও অ্যানালাইসিস ও অনলাইন কোচিংয়ের মাধ্যমে।

সামাজিক বাধা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ
নারী ফুটবলারদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ আজও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। পরিবার ও সমাজের অনেকেই এখনো ফুটবল খেলাকে নারীদের জন্য ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মনে করেন। খেলোয়াড়দের পোশাক, মাঠে সময় কাটানো কিংবা পুরুষ কোচের অধীনে অনুশীলনের বিষয়েও রয়েছে নানা আপত্তি। অনেক মেয়ে এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে মাঝপথেই খেলা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

তবে আশার কথা হলো, অনেক অভিভাবক এখন ধীরে ধীরে সচেতন হচ্ছেন। বিশেষ করে যেসব পরিবার ইতোমধ্যে খেলাধুলার সুফল বুঝতে পেরেছেন, তারা অন্যদেরও এগিয়ে আসার অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন।

সরকার ও ক্রীড়া কর্তৃপক্ষের প্রতি প্রত্যাশা
নারী ফুটবলের বিকাশে সরকারের ভূমিকা এখন পর্যন্ত সীমিতই বলা চলে। সিলেটের মাঠগুলোতে মেয়েদের জন্য নির্ধারিত সময়, পৃথক অনুশীলন সুবিধা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বাফুফের পক্ষ থেকেও সিলেট অঞ্চলে নারী ফুটবলকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই।

স্থানীয় খেলোয়াড় ও সংগঠকেরা দাবি করছেন, সিলেটে একটি পূর্ণাঙ্গ নারী ফুটবল একাডেমি স্থাপন করা হোক, নিয়মিত জেলা ও বিভাগীয় লিগ আয়োজন করা হোক এবং প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করে জাতীয় পর্যায়ে উন্নীত করার ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

শেষ কথা
সিলেটের নারী ফুটবলাররা তাদের স্বপ্ন ও সাহসের গল্প দিয়ে প্রমাণ করে চলেছেন যে সুযোগ পেলে তারাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের নাম উজ্জ্বল করতে পারেন। প্রয়োজন শুধু প্রশিক্ষণ, পৃষ্ঠপোষকতা ও সম্মানের পরিবেশ। পরিবর্তনের হাওয়া ইতিমধ্যেই বইতে শুরু করেছে, এখন দরকার সেটিকে এক সুসংগঠিত কাঠামোয় রূপ দেওয়া। তখনই হয়তো ফুটবল মাঠে সিলেট হবে দেশের গর্বের আরেক নাম। নারী এগিয়ে যাবে সম্বাবনায় প্রতিটা ক্ষেত্রে সহযোগী রূপে ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত