প্রকাশ: ০১ আগস্ট ‘ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
একটি সমাজ যেখানে আসক্তি ও অপরাধের আঁধারে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের খুব সহজেই উপেক্ষা করা হয়, সেখানে চার্লির জীবনের গল্পটি এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। একসময় যিনি ছিলেন মাদক, সহিংসতা ও কারাগারের অন্ধকারে বন্দি, সেই চার্লিই এখন দাঁড়িয়ে আছেন পুনর্জাগরণের প্রতীক হয়ে। নিজের জীবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে তিনি আজ সহানুভূতির একজন রূপকার, যিনি তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, যারা এখনো আটকে আছে সেই বৃত্তে যেটি একদিন ছিল তার নিজস্ব বাস্তবতা।
চার্লির পতনের শুরু হয়েছিল মাত্র ১৫ বছর বয়সে, যখন তার সাথে সম্পর্ক তৈরি হয় এক ২৬ বছর বয়সী পুরুষের। ভালোবাসা ও বিদ্রোহের নামে ছদ্মবেশে গঠিত সেই সম্পর্কে সে শিগগিরই আসক্ত হয়ে পড়ে একপ্রকারের “ক্যানাবিস অয়েল”-এর প্রতি, যেটি আদতে ছিল আরও ভয়ঙ্কর মাদক। মাত্র এক সপ্তাহেই তার শরীরিক নির্ভরতা তৈরি হয়। ১৮ বছর বয়সে, সেই পুরুষকেই সে বিয়ে করে—যিনি তাকে বিয়ের রাতেই প্রথমবার আঘাত করেন এবং গর্ভাবস্থায় তার ওপর চলতে থাকে ভয়ানক নির্যাতন। ফলস্বরূপ, সে হারিয়ে ফেলে সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা। সেই সময় থেকেই ছোটখাটো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে সে, যা তাকে নিয়ে যায় প্রথমবারের মতো কারাগারে—তাদের বিবাহের কয়েক দিনের মধ্যেই।
যদিও সে প্রতিজ্ঞা করেছিল আর কখনো জেলে ফিরে যাবে না, কিন্তু মাদক এবং অপরাধের ঘূর্ণিপাকে তার জীবন চলতে থাকে আরও কয়েক দশক। গৃহহীনতা, অপরাধ, ও নিরাপত্তাহীন সম্পর্কের মাঝে সে খুঁজে পায় সাময়িক আশ্রয়। ১৯৯৫ সালে তার জীবনে আসে ইভো—একজন অপরাধজগতের মানুষ—যিনি কিছুটা হলেও তাকে সুরক্ষা দেন এবং টানা ২৮ বছর তার পাশে থাকেন। কিন্তু সেই সম্পর্কও ছিল বেঁচে থাকার সংগ্রামে বাঁধা, ভালোবাসায় নয়। ২০২২ সালের জুলাই মাসে ইভো মারা যান অতিরিক্ত মদ্যপানে। ঘুম থেকে উঠে চার্লি দেখতে পান তার মৃতদেহ। পরে তাকে হত্যার সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়, যদিও পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় মাদক সরবরাহ সংক্রান্ত একটি লঘু অভিযোগ।
এটিই হয়ে ওঠে তার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট।
এই অস্থিরতার মধ্যেই একটি আশার আলো আসে। লিডসে নারীদের জন্য কাজ করা “দ্য জোয়ানা প্রজেক্ট” নামের একটি সংস্থা তার পাশে দাঁড়ায়। তাদের একজন সমাজকর্মী জ্যাকি এবং এক সহানুভূতিশীল বিচারকের মাধ্যমে চার্লি পান দ্বিতীয় সুযোগ। এই বিচারক ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি তাকে প্রশ্ন করেন, “এই নারী কি কখনো পুনর্বাসন কেন্দ্রে গিয়েছেন?”—এই প্রশ্নই বদলে দেয় সবকিছু।
পথ সহজ ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে “জেলের মানসিকতা” নিয়ে বেঁচে থাকা চার্লি প্রথমে বিশ্বাস, উদ্বেগ ও আবেগ মোকাবিলা করতে পারেননি। যখন তিনি ল্যাঙ্কাশায়ারের লিটলডেল হল নামক পুনর্বাসন কেন্দ্রে পৌঁছান, তখন তিনি ভিতরে যেতে পারেননি। বাইরে একটি বাস স্টপে বসে ছিলেন। সেখানেই তার চোখ পড়ে একটি পাথরের ওপর লেখা শব্দটির দিকে—“Hope” (আশা)। যেন কোনো অদৃশ্য ইশারা—ইভোর পক্ষ থেকে, ভাগ্য থেকে, কিংবা নিজেরই অতীতের আর্তনাদ।
৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩ সালে, এক ভয়ঙ্কর ডিটক্স প্রক্রিয়া শেষে তিনি শুরু করেন তার পুনর্বাসনের যাত্রা। এটি ছিল এক দীর্ঘ অনুশীলন, আত্মদর্শন এবং জীবনের প্রতি নতুন উপলব্ধি গড়ে তোলার অধ্যায়। ৪৩ সপ্তাহ ধরে তিনি অংশ নেন কাউন্সেলিং, শিক্ষা এবং থেরাপিতে। তিনি শিখেন কীভাবে সহিংসতা ও আসক্তি একটি প্যাটার্ন, এবং কীভাবে একজন ব্যক্তি ধ্বংস থেকে আবার উঠে দাঁড়াতে পারে। ডিসেম্বর মাসে, তিনি প্রথমবারের মতো দীর্ঘ রাত ঘুমাতে পারেন—একটি সাধারণ ঘটনা, কিন্তু তার জীবনের জন্য ছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
শিক্ষাই তার পুনর্জাগরণের আরেকটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। ল্যাঙ্কাশায়ার উইমেন নামক সংস্থার সহায়তায় তিনি সম্পন্ন করেন জিসিএসই, শিশুর নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ এবং সাপোর্ট ওয়ার্কার হিসেবে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ। এখন তিনি লিটলডেল এবং প্রবেশন সার্ভিসের পিয়ার মেন্টর হিসেবে কাজ করছেন, এবং তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন যারা এখনো নিজের অন্ধকার অতীতের বিরুদ্ধে লড়ছেন। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় ৯ হাজার অনুসারী রয়েছেন, যেখানে তিনি নিয়মিত নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে যাচ্ছেন এবং অন্যদের উৎসাহ দিচ্ছেন।
যদিও তার অতীত মাঝে মাঝে ফিরে আসে দুঃস্বপ্নের রূপে—তবু তিনি আর সেই নারী নন। “লিডসের জাঙ্কি শপলিফটার” পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে এখন তিনি সহানুভূতির একজন মানুষ, এক অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন সংগ্রামী। তার জীবন এখন সেইসব নারীর জন্য এক বাতিঘর হয়ে দাঁড়িয়েছে, যারা এখনো অন্ধকারে হারিয়ে আছে। চার্লির গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নতুন করে শুরু করার জন্য কখনোই দেরি হয়ে যায় না।
চার্লির বয়স ছিল ৪৬, যখন তিনি প্রথমবারের মতো পুনর্বাসন কেন্দ্রে যান। অনেকের কাছে এই বয়সে পরিবর্তন অসম্ভব মনে হতে পারে। কিন্তু তার জন্য এটাই ছিল নতুন জীবনের সূচনা।