প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৫। নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইনসিলেটে জনসংখ্যা ও নগরায়ণের দ্রুত সম্প্রসারণ সত্ত্বেও তিন বছর আগে গঠিত সিলেট ওয়াসা এখনো কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। ২০২২ সালের ২ মার্চ সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী দেশের পঞ্চম ওয়াসা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ‘সিলেট পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ’, যা আজও শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। নগরবাসীর ভাষায়, এই ওয়াসা গঠনের প্রক্রিয়া ছিল রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ এবং বাস্তবতার মাটিতে তার কোনো ছায়া পড়েনি।

তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের প্রত্যক্ষ চাপে এই ওয়াসা গঠনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। তবে এখন অভিযোগ উঠছে, বাজেট বরাদ্দ, জনবল কাঠামো, ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ এবং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ছাড়া এই সংস্থার নামে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে জনগণের সঙ্গে তামাশা করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পানি সরবরাহ শাখা-২ এর বর্তমান উপসচিব আশফিকুন নাহারও বলেছেন, এই ওয়াসা গঠনের প্রস্তাবটি পুরনো সরকারের আমলে উত্থাপিত হলেও তা চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়নি।
এদিকে সিলেট সিটি করপোরেশন বর্তমানে ৪২টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৪টিতে দৈনিক প্রায় ৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করলেও মোট চাহিদা প্রায় ১২.৫ কোটি লিটার। ফলে প্রায় ৮ লাখ মানুষের এই শহরে ভয়াবহ পানি সংকট ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে। বর্ধিত ১৫টি ওয়ার্ডে এখনো কোনো ধরনের পানি সঞ্চালন লাইন স্থাপন হয়নি। এমন বাস্তবতায় ওয়াসার কার্যকর ও স্বতন্ত্র কাঠামো দ্রুত প্রয়োজন হলেও বর্তমানে তা রীতিমতো অচল এক দপ্তরে পরিণত হয়েছে।
ওয়াসার নামে ইতোমধ্যে একটি ১১ সদস্যবিশিষ্ট বোর্ড গঠন করা হয়েছে এবং চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আত্মীয় ডা. এ কে এম হাফিজ। কিন্তু এই বোর্ড শুধু নামেই সক্রিয়, তাদের কাছে নেই কোনো প্রকল্প পরিকল্পনা বা বাস্তবায়নের নির্দেশনা। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকেও কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে কোনো অগ্রগতি দেখানো হয়নি।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমানকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে সিলেট ওয়াসার অর্গানোগ্রাম তৈরি, বিদ্যমান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে কীভাবে ওয়াসা চালু করা যায়, তার পরিকল্পনা তৈরি এবং সম্পদ তালিকা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তিনি এই প্রতিবেদন বহু আগেই পাঠিয়েছেন বলে জানিয়েছেন, তবে এখনো কোনো জবাব বা পদক্ষেপ মন্ত্রণালয় থেকে আসেনি।
অবস্থাদৃষ্টে বোঝা যাচ্ছে, একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক প্রয়োজন পূরণের প্রতিষ্ঠান ‘সিলেট ওয়াসা’কে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর কার্যকর করার ক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতা ছিল না। বরং এটি ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যার বাস্তবায়ন নিয়ে কেউই আর আগ্রহী নয়। এখন বিষয়টি আটকে আছে মন্ত্রণালয়ের অজানা অলিন্দে।
নগরের বেশ কিছু এলাকায় নিয়মিত পানির সংকট এবং নিম্নমানের পানি সরবরাহ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে জালালাবাদ আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে পানি পাচ্ছেন না। হাউস পাম্প বিকল, ময়লাযুক্ত পানি সরবরাহ এবং প্রশাসনিক দায়িত্বহীনতার মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন তারা। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের অভিযোগেও কোনো সাড়া মেলেনি।
সিলেটের নগরবাসীর অভিযোগ, ওয়াসা নামে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা ছিল ওয়াসা কার্যক্রম শুরু হলে নগরের পানি সংকট নিরসন হবে, কিন্তু বাস্তবে আজও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তব রূপ নেয়নি। নতুন সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন মেয়াদ প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও সিলেট ওয়াসা নিয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি, যা স্থানীয়দের হতাশা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে নাগরিক সমাজ এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কাগজে-কলমে নয়, প্রকৃত কার্যক্রম শুরু করতে না পারলে ওয়াসার নামে এই প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নিরর্থক। সিলেটবাসীর মৌলিক চাহিদা পূরণে এবং দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে, নাগরিক ক্ষোভ বিস্ফোরণে রূপ নিতে পারে।









