বিতর্ক, ট্রল আর বেঁচে থাকার লড়াই: আদনান সামির ঝড়ের মতো জীবন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৫
  • ১০৫ বার

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

একসময় প্রেম আর উচ্ছ্বাসের গানে ভরিয়ে রাখা গায়ক হঠাৎই যেন হারিয়ে গেলেন মঞ্চ থেকে। ২০০৬ সালের দিকে ভারতীয় সঙ্গীতাঙ্গনে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঢেউ বইছিল, আর সেই ঢেউয়ের মধ্যেই নিখোঁজ হলেন পাকিস্তান–জন্ম নেওয়া, ভারত–প্রেমী গায়ক আদনান সামি। কয়েক বছর আগেও যাঁর কণ্ঠে বাজত ভালোবাসার মেলোডি, তিনি হঠাৎই হয়ে গেলেন খবরের শিরোনাম—কেউ বলছে তিনি গুরুতর অসুস্থ, কেউ বলছে মৃত্যু সন্নিকটে। তখন তাঁর ওজন ছিল প্রায় ২৮০ কেজি, আর চিকিৎসকের কড়া সতর্কবার্তায় জানানো হয়েছিল—যদি দ্রুত ওজন না কমান, ছয় মাসের বেশি হয়তো বাঁচবেন না। প্রায় এক বছরের অদৃশ্য জীবন শেষে যখন তিনি ফিরে এলেন, তখন আর আগের মানুষটি ছিলেন না—২৮০ কেজি থেকে নেমে মাত্র ৮৫ কেজি, সুস্থ, প্রাণবন্ত এবং নতুন জীবন শুরু করার জন্য প্রস্তুত।

আদনানের জন্ম নিয়ে আজও বিতর্ক আছে। সরকারি নথি বলছে তিনি ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট লন্ডনে জন্মেছিলেন, কিন্তু তাঁর ভাই জুনায়েদ সামি দাবি করেন, জন্ম পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে ১৯৬৯ সালে। বিতর্ক যাই থাকুক, শৈশব থেকেই সঙ্গীত ছিল তাঁর জীবনের মূল সুর। পিতামাতা ছিলেন দুই ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতিনিধি—বাবা পাকিস্তানি, মা ভারতীয়। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই পিয়ানোতে অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়ে সবাইকে চমকে দেন। কিশোর বয়সেই তিনি ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিক্যাল, ওয়েস্টার্ন, জ্যাজ, রক, পপ—সব ধারাতেই হাত পাকিয়ে ফেলেছিলেন। ৯ বছর বয়সে প্রথম কণ্ঠ দেন গানে, আর ১০ বছর বয়সে লন্ডনের এক কনসার্টে কিংবদন্তি আশা ভোঁসলের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। আশা তাঁকে সঙ্গীতে ক্যারিয়ার গড়তে উৎসাহ দেন, যা তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়।

১৯৯০–এর দশকে পাকিস্তানে তিনি জনপ্রিয় গায়ক ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। অভিনয়ও করেন ‘সারগম’ ছবিতে, যা বক্স অফিসে সফল হয়। ছবির নায়িকা জেবা বখতিয়ারকে বিয়ে করেছিলেন, যদিও তিন বছরের বেশি স্থায়ী হয়নি সেই সংসার। ব্যক্তিগত জীবনে অশান্তি চললেও ২০০০ সালের দিকে আশা ভোঁসলের সহায়তায় ভারতে কাজ শুরু করে তিনি তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর ‘কাভি তো নজর মিলাও’ আর ‘তেরা চেহারা’ অ্যালবাম সাড়া ফেলে পুরো ভারতজুড়ে, রেকর্ড ভাঙা বিক্রি হয়, এবং বাংলাদেশেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। পরে বলিউডের একাধিক ছবিতে গান করেন, যেমন ‘সাথিয়া’, ‘লাকি’, ‘লগন’, ‘হাম দিল দে চুকে সনম’। কাওয়ালির পাশাপাশি পপ ও সুফি ধারাতেও নিজের স্বকীয়তা দেখান।

তবে ক্যারিয়ারের শীর্ষ সময়ে ২০০৫ সালে শারীরিক সমস্যায় গান থেকে দূরে সরে যেতে হয়। চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, অতিরিক্ত ওজনই তাঁর জীবনহানির বড় কারণ। তাই শুরু হয় তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধ—ওজন কমানোর লড়াই। মাত্র ১১ মাসে ১৯৫ কেজি ওজন কমিয়ে এনে তিনি রূপান্তরিত হন এক নতুন মানুষে। পরে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘প্রতি মাসে গড়ে ১০ কেজি করে ওজন কমানো ছাড়া আমার সামনে কোনো পথ খোলা ছিল না।’

জন্মসূত্রে পাকিস্তানি হলেও ২০১৫ সালে ভারতের নাগরিকত্ব নেন আদনান সামি। তাঁর দাবি, পাকিস্তানে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি ফেলে এসেছেন, কারণ ভারতের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। এরপর থেকেই তিনি পাকিস্তানের রাজনীতি ও সামাজিক মনোভাবের সমালোচনায় সরব হন, আবার ভারতকে নিয়ে নিজের ভালোবাসার কথাও প্রকাশ্যে বলেন। পাকিস্তানি মিডিয়ায় প্রায়ই তাঁকে নিয়ে ট্রল হলেও তিনি তা হেসে উড়িয়ে দেন—“আগে যখন মোটা ছিলাম, তখনও ট্রল হতো, এখনো হয়।”

বাংলা গানের প্রতিও তাঁর টান আছে। ছোটবেলায় বাবার কাছেই প্রথম বাংলা গান শেখেন, আর আর ডি বর্মণ ও এস ডি বর্মণের ভক্তি তাঁকে বাংলার সুরে মুগ্ধ করে রাখে। তাঁর মতে, ভালো সঙ্গীতের কোনো দেশ নেই—“প্রকৃত ভক্তরা কখনোই শিল্পীকে দেশের গণ্ডিতে আটকে রাখবেন না।”

এখনো গান থেকে সরে যাননি আদনান সামি। নিয়মিত কনসার্ট করেন, নতুন গান প্রকাশ করেন, এবং সাম্প্রতিক অ্যালবাম ‘পুনর্জন্ম’–এ আগের মতোই প্রাণবন্ত সুর তুলে ধরেন। বিতর্ক, ব্যক্তিগত টানাপোড়েন, ট্রল—সবকিছুকে পেছনে ফেলে তিনি এখনো মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করছেন, শিল্পী বেঁচে থাকে তার গানের মধ্য দিয়েই। তাঁর নতুন গান ‘ভিগি শাড়ি’ মুক্তির আগেই শ্রোতাদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি করেছে, আর পুরোনো দিনের মেলোডি ফিরিয়ে আনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ঝড়ের মতো জীবন পেরিয়েও আদনান সামি আজো গাইছেন, আর হয়তো গাইবেন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত