প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের ভিত্তি সুসংহত করার বিষয়ে যে প্রস্তাবগুলো এসেছে, সেগুলো নিয়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে ভিন্নমত থাকলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ঐকমত্য গড়ে উঠেছে।সংবিধান সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলেছিল, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় কার্যকর ভারসাম্যের অভাব একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ প্রধানমন্ত্রীর পদকে প্রায় স্বৈরতান্ত্রিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তাই ভবিষ্যতে একচ্ছত্র ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পারস্পরিক ভারসাম্য আনতে সংস্কার অপরিহার্য। সেই উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতা বণ্টনের প্রস্তাবই মূলত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।সংস্কারের অন্যতম দিক হলো প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা।
প্রথমত, একজন ব্যক্তি আর সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। এত দিন একই ব্যক্তি একাধারে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও ক্ষমতাসীন দলের প্রধান হিসেবে দল, সংসদ ও সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। সংস্কার কমিশন প্রস্তাব দিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন কোনো ব্যক্তি আর দলীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তবে এ সিদ্ধান্তেও বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ভিন্নমত দিয়েছে।আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে নির্বাচন কমিশন গঠনে। আগে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত হতো। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারি দল, বিরোধী দল ও বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বাছাই কমিটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনারদের নাম প্রস্তাব করবে। এরপর রাষ্ট্রপতি সেই তালিকা থেকে নিয়োগ দেবেন। এভাবে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা হলেও রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, আইন কমিশন ও প্রেস কাউন্সিলে সরাসরি নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়া হচ্ছে।সংসদীয় ব্যবস্থায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে কিছু কমিটির নেতৃত্বে। চারটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি এবং আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতি থাকবেন বিরোধী দল থেকে। এটি কার্যকর হলে সংসদীয় কর্মকাণ্ডে সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দলের ভূমিকা দৃশ্যমানভাবে বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত হচ্ছে। আগে প্রধানমন্ত্রী প্রতিস্বাক্ষর দিলেই তা কার্যকর হতো, এখন থেকে মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাগবে এবং বৈঠকে বিরোধী দলীয় নেতার উপস্থিতিও নিশ্চিত করা হবে।অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হচ্ছে। সংস্কার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধান, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক, অ্যাটর্নি জেনারেল, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, ইউজিসি চেয়ারম্যান, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ও বিটিআরসির চেয়ারম্যানসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে সরাসরি রাষ্ট্রপতির নিয়োগের ক্ষমতা থাকবে।
যদিও বিএনপি ও কয়েকটি দল এ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে, তবুও ঐকমত্য অনুযায়ী অন্তত চারটি প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই সরাসরি নিয়োগ দিতে পারবেন।এখানে প্রশ্ন থেকে যায়, বাস্তবে সংস্কার কতটা কার্যকর হবে। কারণ, যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি, বিশেষ করে বিএনপি ও তাদের সহযোগী জোটের ভিন্নমত রয়েছে, তারা ক্ষমতায় এলে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কারের যে মূল উদ্দেশ্য—প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা হ্রাস এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিকেন্দ্রীভূত করা—তা আংশিকভাবে হলেও সীমিত রূপে কার্যকর হচ্ছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সংস্কারের মাধ্যমে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা পায়নি। তবে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্ধারণ, ইসি গঠনে বাছাই কমিটি, গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির নেতৃত্ব বিরোধী দলকে দেওয়া এবং রাষ্ট্রপতির কিছু স্বাধীন নিয়োগের ক্ষমতা—এসবকিছু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একটি অগ্রগতির ইঙ্গিত বহন করছে। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার ভাষায়, “যতখানি ঐকমত্য হয়েছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। সব বিষয়ে না হলেও কিছু ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো সম্ভব হয়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক।”অতএব, বলা যায় যে সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হলে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কিছুটা কমবে এবং রাষ্ট্রপতির ভূমিকা বাড়বে। তবে কতটা কার্যকরভাবে এই পরিবর্তনগুলো টিকে থাকবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা এবং ভবিষ্যতের ক্ষমতাসীন সরকারের দায়িত্বশীলতার ওপর।”