শিশুখাদ্যে আইন ভঙ্গ: স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের গুঁড়াদুধ খাওয়ানোর পরামর্শে উদ্বেগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৫
  • ৩৯ বার

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের একটি বড় অংশ শিশুদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে গুঁড়াদুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন, যা দেশের প্রচলিত আইন ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের স্পষ্ট লঙ্ঘন। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত এক কর্মশালায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এ তথ্য তুলে ধরে বলেন, দেশের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করায় এই সমস্যাটি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফের ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৫৭ শতাংশ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী আইন লঙ্ঘন করে শিশুদের গুঁড়াদুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এর ফলে শিশুরা মায়ের দুধ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অথচ মাতৃদুগ্ধই শিশুর প্রথম এবং সবচেয়ে কার্যকর খাদ্য, যা শুধু পুষ্টিই নয় বরং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মায়ের দুধ শিশুকে ভবিষ্যতের অনেক জটিল রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়। পাশাপাশি মাতৃদুগ্ধদান মায়েদের জন্যও উপকারী, কারণ এটি স্তন ক্যান্সার, ডিম্বাশয় ক্যান্সার এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।

মাতৃদুগ্ধ বিকল্প, শিশুখাদ্য এবং সেগুলোর ব্যবহার্য সরঞ্জামের বিপণন নিয়ন্ত্রণে ২০০৩ সালের আইন এবং ২০১৭ সালের সংশোধিত বিধিমালা থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না। বহুজাতিক ও দেশীয় শিশুখাদ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো নানা কৌশলে চিকিৎসকদের প্রভাবিত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবছর তারা শিশুখাদ্য প্রচারণার জন্য প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করে থাকে। এর ফলে নতুন মা ও পরিবারগুলো বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং চিকিৎসকের পরামর্শকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে শিশুর স্বাভাবিক খাদ্যচক্র নষ্ট করে দেয়।

কর্মশালায় নূরজাহান বেগম বলেন, “আমরা শুধু আইন প্রণয়ন করে দায় শেষ করতে পারি না, প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সচেতন হতে হবে। মায়ের স্বাস্থ্য ভালো থাকলে শিশু দুধ পাবে। কিন্তু দেশে দারিদ্র্য ও অপুষ্টি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক মা নিজেই পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার খেতে পারেন না। এর সঙ্গে কম বয়সে বিয়ে, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষার অভাব এবং পরিবারে সহায়তার ঘাটতি সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।”

তিনি পিতৃত্বকালীন ছুটির বিষয়েও মত দেন। তার মতে, “শিশু যত্ন শুধু মায়ের দায়িত্ব নয়, বাবারও সমান দায়িত্ব রয়েছে। বাবারা যদি সন্তানদের যথাযথ সময় দেন, তাহলে পিতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়া যায় এবং শিশুদের বেড়ে ওঠা আরও স্বাস্থ্যকরভাবে সম্ভব হয়।”

এ সময় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দেশে আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগের অভাবে গুঁড়াদুধ কোম্পানিগুলো নানা ফাঁকফোকর খুঁজে নিজেদের বাজার সম্প্রসারণ করছে। আর চিকিৎসকরা অজান্তে বা কখনও স্বার্থের কারণে শিশুদের জন্য বিপজ্জনক পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম অপুষ্টি ও নানা জটিল রোগের ঝুঁকিতে পড়বে।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশুখাদ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং মায়েদের সঠিক স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টি নিশ্চিত করার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। শিশুর সুস্থ বিকাশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থতা নিশ্চিত করতে মাতৃদুগ্ধ খাওয়ানোর বিকল্প নেই—এই বার্তাই বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহে পুনর্ব্যক্ত করেন বক্তারা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত