এনএসআইয়ের ওপর যেভাবে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার নজর পড়ে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৫
  • ১৫৫ বার

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক ।একটি বাংলাদেশ অনলাইন

জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা বা এনএসআই বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। ১৯৭২ সালের ২৯ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি দীর্ঘ ৫৪ বছরের ইতিহাসে নানা সংকট, ষড়যন্ত্র ও অভিযানের মধ্য দিয়ে দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে ৮০–এর দশক থেকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং’ বা ‘র’-এর নিবিড় নজরদারিতে পড়ে এনএসআই, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশ রাজনীতি ও প্রশাসনের ভেতরে গভীর প্রভাব বিস্তার করে।

১৯৮২ সালের দিকে কালিদাস বৈদ্য ও চিত্তরঞ্জন সুতারের নেতৃত্বে ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি’ নামে বাংলাদেশবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে এনএসআই তা প্রতিহত করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। এ আন্দোলনের পেছনে ‘র’-এর প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলা নিয়ে হিন্দুদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠন। শুধু তাই নয়, তারা ভারতের আশ্রিতদের নিয়ে ‘বঙ্গসেনা’ নামে সশস্ত্র বাহিনীও গড়ে তোলে। এই ষড়যন্ত্র ভণ্ডুল করতে সক্ষম হলেও সেই সময় থেকেই ‘র’ এনএসআইকে দুর্বল করার নীলনকশা প্রণয়ন করে।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। বিশেষ করে ২০০৯ সালের পর থেকে এনএসআই ক্রমশই ভারতের প্রভাবের আওতায় চলে যায় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মনজুর আহমেদ এনএসআইয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। দেশপ্রেমিক ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের কোণঠাসা করে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের অনুগত কর্মী এবং ভারতপন্থি ব্যক্তিদের জন্য সংস্থার দরজা খুলে দেওয়া হয়। ২০১১ সালে প্রায় এক হাজার সদস্য নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, যা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও ভারতীয় দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে হয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। প্রাথমিকভাবে মাত্র ৩৬ জনকে সহকারী পরিচালক নিয়োগের কথা থাকলেও রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণে সেই সংখ্যা বাড়িয়ে ১৪২ জন করা হয়।

নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন, আওয়ামী লীগের ধানমন্ডি কার্যালয়, ভারতীয় দূতাবাস, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সেনাবাহিনীর ভারতপন্থি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রার্থীর তালিকা চূড়ান্ত করা হতো। যেসব প্রার্থী সুপারিশ নিয়ে আসতে পারত না, তাদের প্রবেশপত্র দেওয়া হতো না। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ, মৌখিক পরীক্ষা ও সুপারিশ পাঠানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াই রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে পরিচালিত হয়। এমনকি নিয়োগের আগেই নির্দিষ্ট প্রার্থীদের নাম ঠিক করে রাখা হতো।

এ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগও ছিল প্রকট। বহু প্রার্থী বৈধ কাগজপত্র ছাড়া নিয়োগ পান। চাকরির সুযোগের জন্য ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এ অভিযোগের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সবসময় তা অস্বীকার করে আসছেন।

২০১৪ সালে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শামসুল হক এনএসআইর মহাপরিচালক হলে আত্মীয়প্রীতি নতুন মাত্রা পায়। জানা গেছে, তিনি প্রায় একশরও বেশি আত্মীয়কে সরাসরি নিয়োগ দেন, যা বাংলাদেশ সরকারি চাকরির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। এরপর ২০১৮ সালে মেজর জেনারেল (অব.) টিএম জোবায়ের মহাপরিচালক হলে নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সরাসরি পরামর্শে কাজ করতেন। তার সময়ে এনএসআইর প্রধান কার্যালয় কার্যত ভারতের প্রভাববলয়ে চলে যায়। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়, যার একটি বড় অংশ ছিল ছাত্রলীগ ক্যাডার ও ভারতপন্থি ব্যক্তি।

এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার ফলে এনএসআই শুধু রাজনৈতিক প্রভাববলয়ে আটকে যায়নি, বরং বাংলাদেশের গোয়েন্দা কাঠামোও এক অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণের অধীনে চলে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে এনএসআইর সক্রিয় ভূমিকা ছিল, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে। একাধিক প্রমাণ এখনো এনএসআই সদর দপ্তরে সংরক্ষিত আছে বলে জানা যায়।

যদিও এনএসআইর বর্তমান বা সাবেক কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছেন, তবুও বাস্তবতায় দেখা যায়, সংস্থার ভেতরে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক আনুগত্য, দুর্নীতি, আত্মীয়প্রীতি এবং বহিরাগত প্রভাবের সমন্বয় ঘটেছে। এর ফলে এনএসআইর কার্যক্রম ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত একটি সংস্থার ভেতরে রাজনৈতিক প্রভাব, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাববলয় এবং নিয়োগ দুর্নীতি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ভবিষ্যতে গুরুতর হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকরা। তাঁরা মনে করেন, এনএসআইকে দুর্নীতি ও বিদেশি প্রভাবমুক্ত করে একটি পেশাদার ও নিরপেক্ষ নিরাপত্তা সংস্থা হিসেবে পুনর্গঠন করা এখন সময়ের দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত