সোনারগাঁয়ে পানিবন্দি ১০ গ্রামের মানুষ, দূষিত পানিতে ছড়িয়ে পড়ছে পানিবাহিত রোগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৫
  • ৫৮ বার

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ’২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা ।একটি বাংলাদেশ অনলাইন

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে টানা বর্ষণে উপজেলার সাদিপুর ইউনিয়নের অন্তত ১০টি গ্রামে কৃত্রিম বন্যা ও তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ–নরসিংদী অগ্রণী সেচ প্রকল্পের আওতাভুক্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার পাম্পগুলোর অধিকাংশ বিকল হয়ে পড়ায় বেড়িবাঁধের ভেতরে আটকে থাকা পানি বের করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ভারগাঁও, বাটপাড়া, কাজিপাড়া, দরগাবাড়ী, খিদিরপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, ফসলি জমি ও বাড়ির উঠান পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক পরিবারে বসতঘরের ভেতর পর্যন্ত পানি ঢুকে পড়েছে; নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মানুষ বেকার হয়ে পড়ায় সংকট গভীরতর হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যমতে, জলাবদ্ধতার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। বহু স্কুল–কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে চলাচল করতে না পেরে বাড়িতে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। একইসঙ্গে শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে আশপাশের জলাধার ও খালে ছড়িয়ে পড়ায় পানিদূষণ তীব্র হয়েছে। কিছু এলাকার টিউবওয়েল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ পানির প্রবল সংকট দেখা দিয়েছে; এতে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত অসুস্থতার উপসর্গ ছড়িয়ে পড়ার খবর মিলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি নিষ্কাশনের খালগুলোর অনেকখানি বেদখল ও ভরাটের কারণে কয়েক বছর ধরে বর্ষা এলেই একই সংকট তৈরি হয়, কিন্তু স্থায়ী সমাধান ঝুলে থাকে।

বাটপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আনিছুর রহমান জানান, বেড়িবাঁধ এলাকায় প্রায় প্রতি বর্ষাতেই জলাবদ্ধতা অসহ্য হয়ে ওঠে। রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে থাকায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তীব্র খাদ্যসংকটে পড়ে। তাঁর ভাষ্য, “এই কটাই দিনে দুইবার শুকনা খাবার দিয়েছে উপজেলা থেকে। কিন্তু পানি না নামলে কীভাবে চলবো?” এলাকাবাসীর অনেকে নিজের ঘর ছেড়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বা উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।

পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা রহমান সাংবাদিকদের বলেন, পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রকল্প এলাকায় তিনটি পাম্প রয়েছে, যার মধ্যে দুটি অচল। এ কারণেই আটকে থাকা পানি বের করা যাচ্ছে না এবং ভোগান্তি বাড়ছে। তিনি জানান, দ্রুত কার্যকর পাম্প বসানোর প্রচেষ্টা চলছে এবং ইতিমধ্যে পানিবন্দি মানুষের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ শুরু হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদেরও প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে, যাতে পানিবাহিত রোগের বিস্তার হলে দ্রুত প্রতিকারে নামা যায়।

স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে, অগ্রণী সেচ প্রকল্প এলাকায় টেকসই ড্রেনেজ নকশা, খাল–নদী পুনঃখনন, বেদখল উচ্ছেদ এবং পাম্পিং স্টেশনগুলোর জরুরি সংস্কার ছাড়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তারা বলেন, বর্ষার আগে পাম্পগুলো নিয়মিত সার্ভিসিং করা ও বৈদ্যুতিক–যান্ত্রিক ত্রুটি দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা থাকলে এমন কৃত্রিম বন্যায় জনদুর্ভোগ কমত। একইসঙ্গে শিল্পকারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকলে পানি দূষণ বন্ধ করা যাবে না; সেক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও শিল্পমালিক পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হলে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস–এ, চর্মরোগ ও চোখের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি মানার বিকল্প নেই—বিশেষ করে ফুটিয়ে বা ক্লোরিন মিশিয়ে পানি পান করা, শিশু ও বয়স্কদের জন্য আলাদা সতর্কতা, দূষিত পানিতে দীর্ঘক্ষণ না থাকা এবং খোলা খাবার পরিহার করা জরুরি। টিউবওয়েল ডুবে থাকলে বিকল্প নিরাপদ পানির উৎস নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তাৎক্ষণিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

ক্ষয়ক্ষতির নির্ভরযোগ্য হিসাব এখনো প্রকাশ না হলেও কৃষিজ জমি, গৃহস্থালি আসবাব ও স্থানীয় সড়ক–যোগাযোগের অবকাঠামোর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে বলে এলাকাবাসীর ধারণা। সড়ক ডুবে থাকায় নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে; দিনমজুর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আয়–রোজগার হারিয়ে বিপাকে পড়েছেন। দুর্যোগ–পূর্ব প্রস্তুতি ও পরবর্তী পুনর্বাসনে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের পাশাপাশি জরুরি খাদ্য সহায়তা, বিশুদ্ধ পানির ট্যাংকার, মোবাইল চিকিৎসা টিম, অস্থায়ী স্যানিটেশন ও বর্জ্য অপসারণ—এসব বিষয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা এখনই বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।

বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, বেপরোয়া নগরায়ণ, খাল–নদী ভরাট ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সম্মিলিত চাপে সোনারগাঁসহ আশপাশের জনপদে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা নতুন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এই প্রবণতা থামাতে প্রকল্পভিত্তিক তাৎক্ষণিক মেরামত নয়, বরং নদী–খাল–জলাধারকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত জলব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর সক্ষমতা জোরদার করাই সময়ের দাবি।

এমন প্রেক্ষাপটে সোনারগাঁয়ের পানিবন্দি মানুষ দ্রুত ও টেকসই সমাধান চান। তাদের প্রত্যাশা, অচল পাম্পগুলো অবিলম্বে সচল করে পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করা, বেদখল–ভরাট খালগুলো পুনঃখনন ও আইনের আওতায় আনা, এবং স্বাস্থ্য–পানি–স্যানিটেশন সেবা বিস্তৃত করে পানিবাহিত রোগের বিস্তার ঠেকানো হবে। অন্যথায় মৌসুমী বৃষ্টিপাতের প্রতিটি দফায় একই দুর্ভোগ নতুন করে ফিরে আসবে এবং দারিদ্র্য–স্বাস্থ্য–শিক্ষা—সব খাতেই ক্ষয়ক্ষতি হবে বহুগুণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত