র’ নিয়ন্ত্রিত এনএসআই-এর অভ্যন্তরে গোপন কাঠামো ‘এনএসজি’, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় অশনি সংকেত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৫
  • ১০৪ বার

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইকে কেন্দ্র করে একাধিক বিস্ফোরক তথ্য সামনে এসেছে, যা দেশটির সার্বভৌম নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। অভিযোগ উঠেছে, ২০০৯ সাল থেকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রত্যক্ষ প্রভাব ও তত্ত্বাবধানে এনএসআইয়ের ভেতরে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে, যা সময়ের সঙ্গে এতটাই সুসংহত হয়েছে যে সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে এখন তাদের অনুগত কর্মকর্তারা প্রভাব বিস্তার করছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্র এবং প্রকাশিত প্রতিবেদনের দাবি, এই প্রভাবের বিস্তৃতি এতটাই গভীর যে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যত একটি বহিরাগত গোয়েন্দা শক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

২০০০-২০০১ সালের ব্যাচের ১৩ কর্মকর্তা এনএসআইয়ে প্রবেশের পরপরই অভিযোগ ওঠে যে, তাদের নিয়োগে সরাসরি ভূমিকা রেখেছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের প্রভাবশালী মহল। পরে এদের মধ্যে কিছু কর্মকর্তাকে ভারত থেকে বিশেষ গোয়েন্দা প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়, যা বাংলাদেশের গোয়েন্দা কাঠামোয় এক নতুন ধরণের প্রভাব বিস্তারের দ্বার উন্মোচন করে। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মনজুর আহমেদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এনএসআইতে ভারতের প্রভাবশালী এজেন্টদের অবস্থান সুসংহত হয়। শুধু তাই নয়, তিনি বিটিভির সংবাদ পাঠিকা শিরিন শিলার সঙ্গে যৌথভাবে একটি ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠা করেন, যা গোপনে ‘র’-এর স্বার্থ রক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানা যায়। গুলশান টেলিফোন এক্সচেঞ্জের সুইচিং ও মিটারিং সিস্টেম বাইপাস করে গোপন যোগাযোগ সুবিধা প্রদানও এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও আজ পর্যন্ত কোনো কার্যকর ফলাফল প্রকাশ হয়নি।

সময়ের পরিক্রমায় এনএসআইয়ের সিনিয়র পদগুলোতে ভারত-ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়োগ নিশ্চিত করা হয়। সশস্ত্র বাহিনী থেকে প্রেষণে আসা কর্মকর্তাদের মধ্যেও ‘র’-এর অনুগতদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, অভিযোগ রয়েছে, তাদের জন্য আলাদা একটি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে যার নামকরণ করা হয়েছে ‘এনএসজি’ (NSI Security Guard)। ভারতের এলিট ফোর্স ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ডের (NSG) নামের সঙ্গে মিল রেখেই এই নাম দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এ কাঠামোর কর্মকর্তাদের বেতন, গাড়ি, ড্রাইভার এবং সিকিউরিটি গার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে ‘সোর্স মানি’ থেকে, যা সাধারণত গোপন গোয়েন্দা তহবিল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

২০০৯ সালের পর থেকে এনএসআইয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দলীয় আনুগত্যকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের ক্যাডার, আওয়ামী লীগ নেতাদের আত্মীয়স্বজন এবং ভারত-ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের পরিবার-পরিজনকে এনএসআইতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১২ সালের ব্যাচের পর ২০১৪, ২০১৬, ২০১৭, ২০২২ এবং ২০২৩ সালের ব্যাচে নিয়োগ পাওয়া অধিকাংশ কর্মকর্তাই ছিলেন রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে নির্বাচিত। উদাহরণস্বরূপ, পলাতক সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ভাতিজি নাহরিন চৌধুরী লিখিত পরীক্ষায় ফেল করেও ২০২২ সালে সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ পান। একই সঙ্গে তার স্বামী রুবাইয়েত ইমাম শোভনকেও স্ট্র্যাটেজিক শাখায় নিয়োগ দেওয়া হয়। আবার সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদের চাচাতো ভাই আল আমিন এবং তার আত্মীয়-পরিজনদেরও একসঙ্গে এনএসআইতে নিয়োগ দেওয়া হয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের নাতি এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর মেয়ে ফারাহ ফয়েজকেও এভাবে পদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সূত্র বলছে, বর্তমানে এনএসআইর অতিরিক্ত পরিচালক পদ থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ও স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালাইসিসসহ অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে ‘র’-ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এতে করে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা নীতিমালা, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং সংবেদনশীল তথ্যপ্রবাহ বহিরাগত শক্তির হাতে চলে যাওয়ার বাস্তব ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

গোয়েন্দা বিশ্লেষকরা বলছেন, এনএসআই যদি বহিরাগত কোনো শক্তির প্রত্যক্ষ প্রভাবাধীন হয়, তবে তা শুধু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলবে না, বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সংস্থাটির ভেতরে যদি গোপন কাঠামো ও বিদেশ-ঘনিষ্ঠ নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকে, তবে তা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিতে পারে।

এই বিস্ফোরক অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি। তবে এনএসআই ও সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য না আসায় প্রশ্নের পর প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিষয়টি যদি সত্য হয় তবে দেশের নিরাপত্তা নীতির ওপর আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে এবং ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত