প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন্ন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) এবং হল সংসদ নির্বাচন ঘিরে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে। তবে নির্বাচনকে ঘিরে সম্ভাব্য উত্তেজনা ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে। নির্বাচনকালীন ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও মজবুত করতে তিন দিনের জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেমন স্বস্তি এসেছে, তেমনি উদ্বেগও দেখা দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এবং নির্বাচন কমিশনের সদস্যসচিব এ কে এম রাশিদুল আলম বৃহস্পতিবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইতিমধ্যে বিভিন্ন প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। তার ভাষায়, “জাকসু নির্বাচনের সময় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বা অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হচ্ছে। এ লক্ষ্যে পার্শ্ববর্তী প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনের দিন, তার আগের দিন এবং নির্বাচনের পরদিন সেনা মোতায়েনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে সেনাপ্রধানের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার এ বি এম আজিজুর রহমানও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ১৩ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেনাপ্রধানের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। এ উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশনের লিখিত অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে। তার ভাষায়, “আমরা নির্বাচন কমিশনের অনুরোধ পেয়ে দ্রুত সেনাপ্রধানের কাছে আবেদন করেছি, কারণ প্রশাসনের দায়িত্ব হলো একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করা।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে জাকসু নির্বাচন সর্বশেষ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯১ সালে। দীর্ঘ তিন দশক পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী মনে করছেন, এই নির্বাচন তাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে পুনরুজ্জীবিত করবে। তবে অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব এবং দলীয় ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব নির্বাচন প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে।
নিরাপত্তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়াও লক্ষ্য করা গেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, সেনা মোতায়েন হলে ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা বজায় থাকবে এবং নির্বাচনের পরিবেশ আরও নিরাপদ হবে। অন্যদিকে কিছু শিক্ষার্থী প্রশ্ন তুলেছেন, সেনা মোতায়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে অপ্রয়োজনীয় ভীতি তৈরি করতে পারে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মহলের একটি অংশও মন্তব্য করেছেন। তারা মনে করেন, দীর্ঘ বিরতির পর অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনকে ঘিরে প্রশাসনের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজনীয়। একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বলেন, “কোনোভাবেই এই নির্বাচন সহিংসতায় রূপ নিতে দেওয়া যাবে না। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণের জন্য প্রশাসনের দায়িত্ব হলো শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচন শুধু একটি ক্যাম্পাসভিত্তিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এর প্রভাব বৃহত্তর রাজনীতিতেও প্রতিফলিত হতে পারে। কারণ ছাত্ররাজনীতি বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি ঐতিহাসিক শিক্ষাঙ্গনে দীর্ঘ বিরতির পর নির্বাচন হওয়াটা রাজনৈতিক অঙ্গনেও একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করছে বলে জানা গেছে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ইতিমধ্যে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। সেনাবাহিনী মোতায়েন হলে তারা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবে, অর্থাৎ যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত জাকসু নির্বাচনকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। তবে প্রশাসনের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নির্বাচনের গুরুত্ব ও ঝুঁকি—উভয়কেই সামনে নিয়ে এসেছে। এখন শিক্ষার্থীরা তাকিয়ে আছেন নির্বাচনের দিনের দিকে, যেদিন তারা দীর্ঘ বিরতির পর তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পাবেন।