প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা। একটি বাংলাদেশ অনলাইন
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বরাবর সম্প্রতি দাখিল করা অভিযোগে পিরোজপুরের ব্যক্তি সুখরঞ্জন বালী দাবি করেছেন, ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর তাকে আইসিটি চত্বর থেকে অপহরণ করা হয়েছিল এবং পরে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই সময় তার ওপর সশস্ত্র ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল।
অভিযোগ গ্রহণের পর সাংবাদিকদের তাজুল ইসলাম জানান, শেখ হাসিনার শাসনামলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অনেক মানুষকে গুম করার ঘটনা ঘটেছে, এবং আদালত চত্বর থেকেও এমন ঘটনা ঘটেছে। সুখরঞ্জন বালীকে একই প্রক্রিয়ায় গুম করার অভিযোগ উঠেছে।অভিযোগপত্রে সুখরঞ্জন বালী উল্লেখ করেছেন, তার ভাই বিশেশ্বর বালীকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করেছিল। ২০১০ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন তার কাছে এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তথ্য জানতে চান। বালী জানান, তিনি প্রকৃত হত্যাকারীদের নাম উল্লেখ করে সত্য ঘটনা জানান, কিন্তু হেলাল উদ্দিন তাকে চাপ প্রয়োগ করে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নামও যুক্ত করে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করেন। সাক্ষ্য দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে শারীরিক নির্যাতন ও হুমকির মুখে পড়তে হয়। অভিযোগে আরও উল্লেখ আছে, স্থানীয় এমপি, পৌর মেয়র এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে তাকে পিরোজপুর রাজশদী স্কুলে এনে ক্রমাগত চাপ ও হুমকি দেওয়া হয়।
অভিযোগে বালী জানিয়েছেন, ট্রাইব্যুনালের গেটের বাইরে তাকে সাদা পোশাকধারী পুলিশ আটক করে গাড়ি থেকে জোরপূর্বক নামিয়ে চোখ ও হাত বেঁধে একটি অজানা স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে প্রায় দুই মাস তাকে খাদ্য ও আলো থেকে বঞ্চিত রেখে বৈদ্যুতিক শক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। তার দাবি, তাকে কোটি টাকা ও একটি বাড়ি দেওয়ার প্রলোভন দেওয়া হলেও তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজি হননি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, পরে তাকে সীমান্ত এলাকায় নিয়ে গিয়ে বিজিবি ও বিএসএফের হাতে হস্তান্তর করা হয়। বিএসএফ তাকে জোরপূর্বক মারধর এবং আটক করে দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঁচ বছর ধরে রাখে। এই সময় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং নির্যাতনের তথ্য নথিভুক্ত করে। দেশে ফিরে নিরাপত্তার কারণে বালী নিজ গ্রামে না গিয়ে আত্মগোপনে থাকেন।
ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়েরের সময় বালী উল্লেখ করেছেন, তার আইনজীবীরা তখনই অপহরণের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন, কিন্তু তৎকালীন বিচারক ও চিফ প্রসিকিউটরের সঙ্গে আলোচনায় ওই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখার অনুমতি দেওয়া হয়নি, এবং আইনজীবীদের বিরুদ্ধে উল্টো আদালত অবমাননার মামলা করা হয়।
অভিযোগে বাকি আসামিদের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর, পৌর মেয়র, জেলা আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতৃবৃন্দ এবং আইনজীবীরা।
চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা অভিযোগ পেয়েছি। তদন্তে দেখা হবে, কে কত বড় পদে ছিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির নাম এসেছে। তদন্ত শেষে যদি পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের কাছে রয়েছে ডকুমেন্ট, যা দেখাবে বিগত ১৬ বছরে মানুষকে গুম করার প্রক্রিয়া ও তার পৃষ্ঠপোষকতা।”
অভিযোগ দায়েরের সময় উপস্থিত ছিলেন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী এবং তার আইনজীবী পারভেজ হোসেন।