অবৈধ বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠাচ্ছে যুক্তরাজ্য ও কানাডা, বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়াও হুমকির মুখে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৫
  • ৭০ বার
অবৈধ বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠাচ্ছে যুক্তরাজ্য ও কানাডা, বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়াও হুমকির মুখে

প্রকাশ: ২৮ অগাস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন

যুক্তরাষ্ট্রের পর এবার অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে যুক্তরাজ্য ও কানাডা। স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আগামীকাল শুক্রবার লন্ডন থেকে একটি বিশেষ ফ্লাইটে অন্তত ১৮ জন অবৈধ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানো হবে। তবে শেষ মুহূর্তে এই সংখ্যা বাড়তে বা কমতে পারে। অন্যদিকে কানাডাও একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বলে ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির হাইকমিশনার অজিত সিং সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জানিয়েছেন।

অবৈধ অভিবাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান সংকটে পড়ছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশ যদি নিজস্ব উদ্যোগে অবৈধ অভিবাসন রোধ করতে না পারে তবে ভবিষ্যতে আরও বড় সমস্যার মুখে পড়তে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এ সংকট আমাদেরই তৈরি এবং আমাদেরই এটি সমাধান করতে হবে, নচেৎ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, পশ্চিমা দেশগুলোতে অভিবাসন এখন একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। অনেক দেশে নির্বাচনের ফল নির্ধারণেও এই ইস্যুটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও আলোচনার ক্ষেত্রেও বিষয়টি বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এটি একদিকে বিব্রতকর, অন্যদিকে বৈধ অভিবাসনের সুযোগকেও সংকুচিত করছে। একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অবৈধ অভিবাসনের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। পশ্চিমা দেশগুলো স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা বৈধ অভিবাসনকে উৎসাহিত করতে চায়, কিন্তু অবৈধ প্রবেশ যদি অব্যাহত থাকে তবে তা বৈধ প্রক্রিয়ার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

অবৈধ পথে যাওয়া বাংলাদেশিদের সংখ্যা যে কতটা ভয়াবহ আকার নিয়েছে তা বোঝা যায় ইউরোপের ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালিতে প্রবেশের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান থেকে। গত ছয় মাসে ইতালিতে প্রবেশ করেছে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ, যার মধ্যে প্রায় ৩৩ শতাংশই বাংলাদেশি। এই বিশাল সংখ্যক অবৈধ অভিবাসী শুধু ইউরোপ নয়, উত্তর আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইতালির সঙ্গে বাংলাদেশের অভিবাসন ইস্যু বর্তমানে সবচেয়ে জটিল আকার ধারণ করেছে। ইতালি সরকার ‘ফলুসি ডিক্রি’ কর্মসূচির মাধ্যমে মৌসুমি ও অমৌসুমি খাতে শ্রমিক নিয়োগ করে থাকে। দীর্ঘ আট বছর বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালে বাংলাদেশ আবার এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত হয়। সে সময় নতুন করে হাজারো বাংলাদেশির ইতালিতে কাজের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু পরে দেখা যায়, বিপুল সংখ্যক আবেদনকারীর জমা দেওয়া ওয়ার্ক পারমিট ও অন্যান্য নথি ভুয়া। ২০২৩ সালে ইতালি সরকার ১৬ হাজার ৮৭৯ জন বাংলাদেশিকে ভিসা দিলেও পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাছাই করে অসংখ্য জাল কাগজপত্রের তথ্য পায়। এর ফলে ২০২৪ সালে মাত্র এক হাজার ১৬৪ জন বাংলাদেশিকে ভিসা দেওয়া হয় এবং ২০২৪ সালের অক্টোবরে ইস্যু করা সব ওয়ার্ক পারমিট স্থগিত করে ইতালি। এতে প্রায় ৪০ হাজার ভিসা আবেদন অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে থাকে। অনেক আবেদনকারী ইতালিতে যাওয়ার জন্য দালালচক্রের হাতে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত খুইয়েছেন। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে, গত জুলাই মাসে ঢাকায় ইতালির দূতাবাসের সামনে শত শত ভুক্তভোগী বাংলাদেশি বিক্ষোভ করে।

এদিকে যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছিল। অবশেষে বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে এবং প্রথম পর্যায়ে ১৮ জনকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। তাদের জন্য ইতোমধ্যেই ট্রাভেল পাস ইস্যু করেছে বাংলাদেশ সরকার। সাধারণত কোনো দেশে অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের তালিকা হাতে পাওয়ার পর তা যাচাই-বাছাই শেষে নিশ্চিত হলে এ ধরনের পাস দেওয়া হয়। তবে বর্তমানে যুক্তরাজ্যে কতজন অবৈধ বাংলাদেশি রয়েছে তা নির্দিষ্টভাবে জানায়নি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ, যদিও তারা ইঙ্গিত দিয়েছে সংখ্যাটি অনেক বড়।

যুক্তরাষ্ট্রও সম্প্রতি বাংলাদেশি অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো শুরু করেছে। চলতি মাসের শুরুতে একটি সামরিক বিমানে করে ৩৯ জন অবৈধ বাংলাদেশিকে ঢাকায় পাঠানো হয়। কানাডার ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। দেশটির হাইকমিশনার জানিয়েছেন, কানাডা বৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের স্বাগত জানায়, কিন্তু আবেদনকারীদের জমা দেওয়া নথিপত্রের ৯০ শতাংশই ভুয়া বলে প্রমাণিত হচ্ছে। এর ফলে যাচাই-বাছাই দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং বৈধ প্রক্রিয়ায় আবেদনকারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অবৈধভাবে কানাডায় বসবাসকারী বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তবে কতজন ও কখন তা পাঠানো হবে সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট করা হয়নি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করতে না পারলে বাংলাদেশি শ্রমবাজার পশ্চিমা দেশগুলোতে সংকুচিত হয়ে পড়বে। ইতোমধ্যেই ভিসা প্রক্রিয়ার অনিয়ম এবং দালালচক্রের প্রভাব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার সতর্ক করা হচ্ছে যে, এসব কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে বৈধ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, অবৈধ অভিবাসন এখন কেবল একটি মানবিক বা সামাজিক সমস্যা নয়, বরং বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ক, অর্থনীতি এবং শ্রমবাজারের জন্যও বড় ধরনের সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত