ইসরাইলের গণহত্যা  হতাশা এড়িয়ে টিকে থাকবেন কীভাবে?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৫
  • ১১২ বার
ইসরাইলের গণহত্যা  হতাশা এড়িয়ে টিকে থাকবেন কীভাবে?

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

গাজা ও পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি আগ্রাসনের বর্তমান অধ্যায় শুরু হওয়ার পর দুই বছর পেরিয়ে গেছে। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ভয়াবহ চিত্র উঠে আসছে, তা কেবল হতাশাই নয়, মানবতার প্রতি এক গভীর আঘাত। প্রতিদিনের খবর আমাদের সামনে হাজির করছে নতুন নতুন হত্যাযজ্ঞ, ধ্বংসযজ্ঞ, দুর্ভিক্ষ এবং শিশু হত্যার হৃদয়বিদারক দৃশ্য। এই অমানবিক বাস্তবতা একবিংশ শতাব্দীর সভ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করলেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ বলছে, গাজায় নিহতদের সিংহভাগই বেসামরিক মানুষ। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর নিজস্ব হিসাবেও নিহতদের মধ্যে প্রায় ৮৩ শতাংশই সাধারণ নাগরিক। শিশু, নারী, চিকিৎসক, সাংবাদিক এমনকি সাহায্যকর্মীরাও টার্গেট হত্যার শিকার হচ্ছেন। ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, স্কুল ও মসজিদ ধ্বংস হয়ে গেছে। খাদ্য ও পানির অভাবে চলছে গণদুর্ভিক্ষ। জাতিসংঘের ভাষায়, এটি “মহাকাব্যিক মাত্রার মানবিক বিপর্যয়।”

তবুও পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাবশালী অংশ ইসরাইলকে সমর্থন করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অনেক রাষ্ট্র ইসরাইলের সামরিক সহায়তায় অংশ নিচ্ছে, অথবা নীরব থেকে সহযোগিতা করছে। সমালোচকরা বলছেন, এই অবস্থান কার্যত গণহত্যার সহায়তাকারীর ভূমিকাই বহন করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের একটি অংশ তথ্য বিকৃতি, বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন এবং সত্য গোপনের মাধ্যমে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ বেশ কিছু প্রভাবশালী সংবাদপত্রে এমন সব লেখা প্রকাশিত হচ্ছে, যেখানে গাজায় ঘটমান হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যা বলতে অনীহা দেখা যাচ্ছে। বরং তারা যুক্তি দাঁড় করাচ্ছে, নিহতের সংখ্যা ‘গণহত্যা’ হিসেবে গণ্য করার মতো পর্যায়ে পৌঁছেনি। এই ধরণের অবস্থান শুধু সাংবাদিকতার নৈতিকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং মানবতার প্রতি সরাসরি অবমাননা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

বিশ্ববাসীর হতাশা বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তা। ফিলিস্তিনের জন্য সমর্থন ও প্রতিবাদ থাকলেও তা বাস্তব সমাধানে রূপ নিচ্ছে না। মানবাধিকার কর্মী, গবেষক ও নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ নাগরিকরা প্রশ্ন তুলছেন—বিশ্ব যখন অন্যত্র মানবাধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষার কথা বলে, তখন ফিলিস্তিন ইস্যুতে কেন এই ভিন্নতা? কেনো মাত্র একটি ছোট সাহায্যের নৌকাও গাজায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না?

অন্যদিকে ইসরাইলি নেতারা ও তাদের চরমপন্থী সহযোগীরা প্রকাশ্যে বলছেন, গাজা ও পশ্চিম তীরকে ‘নিষ্প্রাণ ভূমি’তে পরিণত করা তাদের লক্ষ্য। এর ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলি নীতিকে অনেকেই সরাসরি জাতিগত নির্মূল অভিযান হিসেবে অভিহিত করছেন। ইতিহাসে হিটলার, পল পট কিংবা রাটকো ম্লাদিকের মতো বর্বর নেতাদের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতি। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিটি শাসক ও আদর্শের নৃশংসতা ভিন্ন ধরনের, আর ইসরাইলি জায়নবাদকে তার নিজস্ব ভয়াবহতায় বিচার করতে হবে।

মানবতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া অনেক ইহুদিও ইসরাইলি রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডে শিউরে উঠছেন। তারা বলছেন, ইহুদি জাতির নামে এই গণহত্যা ইতিহাসে ভয়াবহ কলঙ্ক হয়ে থাকবে। একইভাবে বিশ্বজুড়ে নৈতিক মানুষরা প্রশ্ন তুলছেন—আমরা কি কেবল অসহায়ভাবে লাশ গুনেই যাব? আমাদের বিবেক কি কেবল ক্ষোভ আর হতাশায় নিঃশেষ হয়ে যাবে?

গণহত্যা অস্বীকার ও তথ্য বিকৃতির পাশাপাশি ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণাও নতুন করে তীব্র হয়েছে। কিছু লেখক ও বিশ্লেষক সরাসরি মুসলিমদের টার্গেট করে ইসরাইলের হত্যাযজ্ঞকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সমালোচকরা বলছেন, এটি নতুন কিছু নয়। বরাবরই মুসলিমবিদ্বেষকে পুঁজি করে জায়নবাদী আগ্রাসনকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে, অন্যদিকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

তবে একই সঙ্গে প্রতিরোধের মনোবলও ভেঙে যায়নি। ফিলিস্তিনিদের মধ্যে এখনো বিশ্বাস ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা টিকে আছে। লেবানন ও ইয়েমেনের মতো অঞ্চল থেকেও প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রকাশ ঘটছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশ্বাসই প্রতিদিন নতুন প্রজন্মকে সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করছে, যদিও পরিস্থিতি একেবারেই বৈরী।

বিশ্বের অনেক নাগরিক বলছেন, মুসলিম, খ্রিষ্টান বা ইহুদি পরিচয় এখানে মুখ্য নয়। মুখ্য হলো মানবতার প্রশ্ন, বিবেকের প্রশ্ন। আজকের দিনে যদি গণহত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান না নেওয়া হয়, তবে মানবসভ্যতার অস্তিত্বই ঝুঁকির মুখে পড়বে।

সত্য-মিথ্যার এই সংঘাতে একমাত্র পথ হলো ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামের পাশে দাঁড়ানো। তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করা। কারণ, মানবিকতা, বিবেক ও নৈতিকতা রক্ষার জন্যও এই সংগ্রাম অপরিহার্য। ইতিহাসের বিচার একদিন স্পষ্ট করে দেবে কে হত্যাকারীর পক্ষে ছিল আর কে মানবতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত