সাক্ষরতার প্রকৃত চিত্র নিয়ে নতুন করে বিতর্ক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৪০ বার
সাক্ষরতার প্রকৃত চিত্র নিয়ে নতুন করে বিতর্ক

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫
নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। সরকারি প্রতিবেদনে যে তথ্য তুলে ধরা হয়, তা বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেই প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের প্রাক্কালে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ২০০৯ সালে সাক্ষরতার হার ছিল প্রায় ৫৬ দশমিক ৮ শতাংশ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নানা প্রকল্প ও কার্যক্রমের মাধ্যমে এই হার দ্রুত বাড়ানো হয় এবং ২০২৩ সালে ক্ষমতা ছাড়ার আগমুহূর্তে দেখানো হয় ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও ২০২৪ সালে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ উল্লেখ করেছে। চলতি বছরও সেই একই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। তবে শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংখ্যা অনেকটাই অবাস্তব, প্রকৃত সাক্ষরতার হার ৫০ শতাংশের নিচে থাকতে পারে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার নিজেই সম্প্রতি বলেছেন, দেশের প্রকৃত সাক্ষরতার হার সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সমীক্ষা নেই। তিনি জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও পড়া-লেখা শেখার মূল লক্ষ্য পূরণ হয়নি। চট্টগ্রামের এক অনুষ্ঠানে তিনি সরাসরি মন্তব্য করেন, ‘‘আমাদের কাগজে-কলমে সাক্ষরতার হার ৭৮ শতাংশ বলা হলেও বাস্তবে তা অনেক কম। নিরক্ষর জাতি দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়।’’

সাক্ষরতার প্রকৃত চিত্র নিয়ে নতুন করে বিতর্ক

আজ পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ২০২৫’। এ বছরের প্রতিপাদ্য—‘প্রযুক্তির যুগে সাক্ষরতার প্রসার’। সরকারি-বেসরকারি নানা কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে আলোচনা সভা, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা সম্মাননা প্রদান ও তারুণ্যের উৎসব অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা।

গতকাল সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাক্ষরতা কেবল অক্ষরজ্ঞান নয়, বরং মাতৃভাষায় পড়া, লেখা, অনুধাবন, যোগাযোগ এবং গণনার মতো মৌলিক দক্ষতা অর্জনই প্রকৃত সাক্ষরতার সংজ্ঞা। তিনি আরও বলেন, এখনও প্রায় ২২ দশমিক ১ শতাংশ জনগোষ্ঠী নিরক্ষর, যারা মূলত ঝরে পড়া শিশু ও শিক্ষাবঞ্চিত নারী-পুরুষ। তাদেরকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা মনে করেন, পরিসংখ্যানের গরমিল সমস্যার মূলে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন, পূর্ববর্তী সরকার বছর বছর সাক্ষরতার হার বাড়িয়ে দেখালেও এর পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। তার মতে, সঠিক তথ্যভিত্তিক সমীক্ষা না হলে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ সম্ভব নয়।

একই মন্তব্য করেছেন শিক্ষাবিদ ড. মনজুর আহমদ। তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করা আর প্রকৃত সাক্ষরতা একই বিষয় নয়। অনেকেই বিদ্যালয় শেষ করেও পড়তে বা লিখতে সক্ষম নয়। অথচ সরকারের প্রতিবেদনগুলোতে কেবল ভর্তি ও উত্তীর্ণ হওয়ার হারকে সাক্ষরতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। বর্তমান সরকারও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে কোনো কমিশন গঠন করেনি বলে তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে বলেন, সাক্ষরতা কেবল পড়ালেখায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং ডিজিটাল জ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও অনলাইনে শিক্ষা গ্রহণের সক্ষমতাও এর অন্তর্ভুক্ত। তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়া মানেই সমাজ ও অর্থনীতির মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া। তাই সাক্ষরতা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন।

জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সকলের জন্য মানসম্মত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, বাংলাদেশের জন্য তা এখন বড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, কাগজে-কলমে সংখ্যার খেলা বন্ধ করে বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়াই এখন জরুরি। অন্যথায় সাক্ষরতার ঘাটতি উন্নয়নকেই বাধাগ্রস্ত করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত