প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
মৌলভীবাজারে রোপা আমনের মৌসুমে কৃষকেরা পড়েছেন চরম বিপাকে। মাঠে ধান রক্ষা করতে না পারলে সারা বছরের ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অথচ গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকলেও বাজারে দেখা দিয়েছে অস্বাভাবিক সংকট। কৃষকরা অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগ নিয়ন্ত্রিত ডিলার সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে এই সংকট তৈরি করেছে এবং সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রতিটি বস্তায় অতিরিক্ত ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। ফলে ন্যায্যমূল্যে সার না পেয়ে কৃষকেরা বাধ্য হয়ে বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মৌলভীবাজার জেলায় মোট ৫৩ জন অনুমোদিত সার ডিলার রয়েছেন। তাদের অনেকেই আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত। এমনকি কারও কারও নাম এসেছে জেলা আওয়ামী লীগের নেতা, তাদের পরিবারের সদস্য বা আত্মীয়স্বজন হিসেবেও। রাজনৈতিক বিবেচনায় এসব ডিলারশিপ প্রদান করা হয়েছে, যার ফলে সারের বাজার নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে। কৃষকদের অভিযোগ, এই সিন্ডিকেট ইচ্ছাকৃতভাবে সার আটকে রেখে বেশি দামে বিক্রি করছে এবং এর ফলে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ কৃষকরা।
সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী এ বছর মৌলভীবাজারে ইউরিয়া ৪ হাজার ২৯৬, টিএসপি ৫৯০, ডিএপি ১ হাজার ৪১৯ ও এমওপি ৮৪০ মেট্রিক টন সরবরাহের কথা ছিল। এর মধ্যে ডিলাররা ইতোমধ্যে ইউরিয়া ২ হাজার ৫ মেট্রিক টন, টিএসপি ৩৩৮ মেট্রিক টন, ডিএপি ৭২০ মেট্রিক টন এবং এমওপি ৪৭১ মেট্রিক টন উত্তোলন করেছে। সরকারি হিসেবে গুদামে এখনো পর্যাপ্ত পরিমাণ সার মজুত আছে। তবুও বাজারে সরবরাহ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কৃষকেরা বলছেন, ডিলাররা অফিসে গেলে ‘বরাদ্দ নেই’ বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, অথচ বেশি দাম দিলে কালোবাজারে সার মেলে।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার জগৎপুর গ্রামের কৃষক কয়েছ আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ধান বাঁচানোর জন্য এখন সার ছাড়া উপায় নেই, কিন্তু ডিলাররা সরকারি দামের চেয়ে অনেক বেশি দাম নিচ্ছে। বাধ্য হয়ে কিনতে হচ্ছে।” শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুনবীর ইউনিয়নের ভিমসি গ্রামের কৃষক মহরম আলী বলেন, “৬ থেকে ৭ মাস ধরে টিএসপি সার মিলছে না। এখন পাওয়া গেলেও প্রতি বস্তা ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা গুনতে হচ্ছে।” কৃষকেরা অভিযোগ করেন, ডিলাররা বিক্রির সময় ম্যামো দিচ্ছে না, ফলে অনিয়মের প্রমাণও লুকিয়ে রাখা হচ্ছে।
অন্যদিকে স্থানীয় খুচরা বিক্রেতারাও সংকটের কথা জানিয়েছেন। শ্রীমঙ্গলের ভুজপুর বাজারের খুচরা সার ব্যবসায়ী আশিকুর রহমান জানান, “চাহিদা অনুযায়ী ডিলাররা আমাদের সার সরবরাহ করছে না। আমরা শুনেছি এসব সার চা-বাগানগুলোতে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।” হবিগঞ্জ ও শায়েস্তাগঞ্জের বাজারে গিয়ে সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা অবশ্য সংকটের বিষয়টি আংশিক স্বীকার করেছেন। শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বলেন, “রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিলার নিয়োগ দেওয়ায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আমরা এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।” তবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ জালাল উদ্দীন দাবি করেন, “কোথাও কোথাও সামান্য ঘাটতি থাকতে পারে, তবে জেলার কোথাও বড় কোনো সংকট নেই। মজুত পর্যাপ্ত আছে।”
এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মো. ইসরাইল হোসেন বলেন, “আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি, যদি কোনো অনিয়ম পাওয়া যায় তবে সংশ্লিষ্ট ডিলারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ আমরা ঊর্ধ্বতন মহলে জানিয়েছি।”
মৌলভীবাজারে চলমান এই সঙ্কট কৃষকদের উৎপাদন ব্যাহত করছে, যা শুধু ধান নয় বরং সামগ্রিক খাদ্যশস্য উৎপাদনেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় কৃষক ও বিশ্লেষকরা। গুদামে পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও বাজারে সংকট তৈরি হলে এর দায় এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন ও সরকার কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে কৃষকদের বাঁচাতে পারে এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কবল থেকে।