প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দীর্ঘদিন ধরেই ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক তিক্ততার মধ্যে রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সীমান্ত উত্তেজনা বারবার দুই দেশের ক্রীড়াঙ্গনেও প্রভাব ফেলেছে। ক্রিকেট—যা একসময় ভারত–পাকিস্তানের বন্ধুত্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো—এখন তা অনেকাংশেই রূপ নিয়েছে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রতিচ্ছবিতে। সেই চিত্র আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠল এশিয়া কাপ টি–টোয়েন্টির সাম্প্রতিক এক ম্যাচে। ম্যাচের আগে টসের সময় এবং ম্যাচের পরে সৌজন্যমূলক করমর্দন এড়িয়ে যায় ভারতীয় দল। প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানও তাদের অবস্থান জানিয়ে দেয়। পুরো ঘটনাকে ঘিরে আলোড়ন তৈরি হয়েছে দুই দেশের গণমাধ্যম ও সমর্থক মহলে।
এশিয়া কাপের ম্যাচটি ছিল টুর্নামেন্টের অন্যতম আকর্ষণ। টসের সময় পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান আলি আগার দিকে এগিয়ে গেলেও ভারতীয় অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব হাত মেলাতে অস্বীকৃতি জানান। সাধারণত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলোয়াড়রা ম্যাচের আগে টস শেষে এবং খেলা শেষে সৌজন্য প্রদর্শন করেন, হাত মেলান। কিন্তু এদিনের ঘটনার ব্যতিক্রম ঘটল। মাঠের দর্শকরা প্রথমে ভেবেছিলেন এটি হয়তো কেবল একটি ভুল বোঝাবুঝি, তবে ম্যাচ শেষে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারতীয় ক্রিকেটাররা তখনো পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করতে যাননি। সাজঘরে থেকে দল বের হলেও সৌজন্য প্রদর্শনের জন্য একবারও এগিয়ে আসেননি ভারতের খেলোয়াড়রা।
পরে পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে সূর্যকুমার যাদব সাংবাদিকদের সামনে ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, “কিছু বিষয় আছে যা খেলার আবেগের থেকেও বড়। সম্প্রতি কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছেন। সেই হামলায় ভারতীয় সেনার সদস্যরাও প্রাণ হারিয়েছেন। আমরা এই জয়টি তাঁদের পরিবার ও ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে উৎসর্গ করেছি। সেই শ্রদ্ধা প্রদর্শনের অংশ হিসেবেই আমরা করমর্দন এড়িয়ে গিয়েছি।” তাঁর মন্তব্য ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় এবং রাজনৈতিক মহলেও তা আলোচনার জন্ম দেয়।
সূর্যকুমারের সঙ্গে মাঠে থাকা শিভম দুবেও পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের হাত মেলানো থেকে বিরত থাকেন। ভারতের অন্য খেলোয়াড় ও সাপোর্ট স্টাফরাও সাজঘরে থেকে নামেননি। অন্যদিকে পাকিস্তান দল পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল হ্যান্ডশেকের জন্য। সালমান আলি আগা ও তাঁর সতীর্থরা অপেক্ষা করছিলেন ভারতের সৌজন্য প্রদর্শনের জন্য, কিন্তু যখন দেখলেন যে প্রতিপক্ষ দল সেই পথে হাঁটছে না, তখন তাঁরা হতাশা নিয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরে যান।
ম্যাচ শেষে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয় যখন পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান আলি আগা ম্যাচ–পরবর্তী আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান বর্জন করেন। সাধারণত ম্যাচ শেষে দুই অধিনায়ক একসঙ্গে উপস্থিত হন পুরস্কার বিতরণীতে এবং ধারাভাষ্যকারদের সঙ্গে মত বিনিময় করেন। কিন্তু সালমান আলি আগা সেখানে যোগ না দিয়ে প্রতিবাদ জানান। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন একজন ভারতীয় ধারাভাষ্যকার, আর সেখানেই অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সালমান। তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, “যদি সঞ্চালক পাকিস্তানি হতেন তাহলে তিনি অবশ্যই অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন।”
এ নিয়ে পাকিস্তান দলের কোচ মাইক হেসন ভারতীয় দলের আচরণকে প্রকাশ্যে “অ–খেলোয়াড়সুলভ” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, ক্রিকেট একটি ভদ্রলোকের খেলা, যেখানে প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন জরুরি। “রাজনৈতিক ইস্যু থাকতেই পারে, কিন্তু খেলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা কোনোভাবেই সঠিক নয়। ভারতীয় দল তাদের আচরণের মাধ্যমে খেলাধুলার স্পিরিট নষ্ট করেছে,” বলেছেন হেসন। পাকিস্তান দলের ম্যানেজমেন্ট এ ঘটনায় ম্যাচ রেফারির কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও দায়ের করেছে।
এ ঘটনায় দুই দেশের সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানি সংবাদপত্রগুলো বলছে, ভারতীয় দল ইচ্ছাকৃতভাবেই খেলাকে রাজনীতির মঞ্চে পরিণত করেছে। অন্যদিকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো সূর্যকুমারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে বলছে, দেশের সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এটি ছিল এক অনন্য পদক্ষেপ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই দেশের সমর্থকেরাও মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। কেউ বলছে, খেলায় রাজনীতি টানা উচিত নয়; আবার কেউ মনে করছেন, জাতীয় স্বার্থই সর্বোচ্চ।
ঘটনার পটভূমিতে রয়েছে চলতি বছরের এপ্রিলে কাশ্মীরের পেহেলগামে সংঘটিত একটি সন্ত্রাসী হামলা। সেই হামলায় ২৬ জন নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছিলেন। ঘটনাটি নিয়ে কয়েকদিন ভারত–পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে ওঠে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সেই ঘটনার ছায়াই এবার নেমে এসেছে এশিয়া কাপে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড শুরুতে পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলতে কিছুটা অনীহা প্রকাশ করলেও পরবর্তীতে সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে দলটি খেলায় অংশগ্রহণ করে।
ক্রীড়া বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারত–পাকিস্তান ম্যাচে এমন ঘটনা আগে কখনো দেখা যায়নি। খেলার আবেগ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও জাতীয় গর্ব সবকিছু মিলিয়ে এই ম্যাচ সবসময়ই অনন্য হয়ে থাকে। কিন্তু খেলাকে কেন্দ্র করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রদর্শনই ক্রিকেট সংস্কৃতির সৌন্দর্য। এবার সেই সৌন্দর্য কলঙ্কিত হলো। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে ভারত–পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সিরিজ আয়োজনের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে যাবে।
অন্যদিকে, সাধারণ সমর্থকের কাছে এই ঘটনা হতাশাজনক। অনেকেই বলছেন, খেলার মাঠে রাজনীতি টেনে আনার মানে হলো খেলার মূল উদ্দেশ্যকেই হারিয়ে ফেলা। খেলা সবসময় একতার বার্তা বহন করে, যেখানে সীমান্ত, ধর্ম কিংবা রাজনীতির বিভাজন মুছে যায়। কিন্তু এই ম্যাচে সেই বার্তা অনুপস্থিত ছিল।
তবে এটিও সত্য, ভারত–পাকিস্তান সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাসে রাজনীতি ও খেলাধুলা সবসময়ই একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থেকেছে। ১৯৯৯ সালের করগিল যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলা, প্রতিটি ঘটনার পরই ক্রিকেট মাঠে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাটিও সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এশিয়া কাপে ভারতীয় দল জয় পেলেও ম্যাচ–পরবর্তী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে হ্যান্ডশেক না করার এই ঘটনা। সালমান আলি আগা বা সূর্যকুমার যাদব— দুই অধিনায়কের অবস্থানই এখন জাতীয় রাজনীতির প্রতীক হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। তবে ক্রিকেটপ্রেমীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে অন্তত খেলাধুলাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে। খেলার মাঠ হবে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ক্রীড়াসুলভ মনোভাবের প্রতিফলন, রাজনীতির প্রতিফলন নয়।
ভারত–পাকিস্তান ম্যাচের ফলাফল বা স্কোরলাইন আজ ততটা আলোচনার বিষয় নয়। বরং আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে সৌজন্যের অভাব, রাজনৈতিক আবেগ এবং খেলার স্পিরিটের ক্ষয়। এক অর্থে বলা যায়, এই ম্যাচে ক্রিকেট নয়, রাজনীতিই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে।