সুশান্তের মৃত্যুর ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন রিয়া

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৭৮ বার
সুশান্তের মৃত্যুর ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন রিয়া

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বলিউড অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যু ছিল ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনাগুলোর একটি। ২০২০ সালের ১৪ জুন মুম্বাইয়ের বান্দ্রার ফ্ল্যাটে ৩৪ বছর বয়সী জনপ্রিয় এই তারকার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। শুরুতে এটি আত্মহত্যা বলে ধরে নেওয়া হলেও পরে একের পর এক নাটকীয় মোড় নেয় পুরো ঘটনা। শোকাহত পরিবার, হতবিহ্বল ভক্ত, ক্ষুব্ধ মিডিয়া আর রাজনৈতিক চাপ মিলিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছিল অস্বাভাবিক এক পরিবেশ। এ ঘটনার পরেই সুশান্তের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে রিয়া চক্রবর্তীকে ঘিরে জন্ম নেয় তীব্র বিতর্ক। আত্মহত্যায় প্ররোচনা, আর্থিক দুর্নীতি থেকে শুরু করে মাদকচক্রের সঙ্গে যোগসাজশ— একের পর এক অভিযোগের তীর ছোড়া হয় তার দিকে।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে নারকোটিকস কন্ট্রোল ব্যুরো (এনসিবি) তাকে গ্রেপ্তার করে। প্রায় এক মাস কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পেলেও থেমে থাকেনি তদন্ত। দীর্ঘ চার বছর ধরে তাকে নানাভাবে জেরা, তদন্ত ও জনসমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। একসময় বলিউডের উদীয়মান অভিনেত্রী থেকে রাতারাতি তিনি হয়ে ওঠেন সংবাদমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। দেশজুড়ে যেন এক প্রচ্ছন্ন বিচার শুরু হয়েছিল তার বিরুদ্ধে, যেখানে আদালতের রায় অপেক্ষা না করেই সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই তাকে অপরাধী ঘোষণা করে ফেলেছিলেন।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলায়। চার বছরের আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে আদালত সব অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন রিয়াকে। প্রমাণিত হয়, সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আইনের দৃষ্টিতে তিনি এখন সম্পূর্ণ নির্দোষ। কিন্তু তবুও সেই সময়কার দুঃসহ অভিজ্ঞতা এবং তীব্র সামাজিক চাপ এখনো তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

সম্প্রতি এনডিটিভি যুবা কনক্লেভ ২০২৫-এ অংশ নিয়ে রিয়া চক্রবর্তী খোলাখুলি নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান। “আনব্রোকেন: রাইটিং দ্য নেক্সট চ্যাপ্টার” শীর্ষক সেশনে তিনি বলেন, “আমাকে শোক করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। তখন চারপাশের পরিস্থিতি এতটাই বিভ্রান্তিকর ও শত্রুভাবাপন্ন ছিল যে, আমি নিজেও বুঝতে পারিনি কীভাবে সব সামলাতে হবে। আমার ব্যক্তিগত শোককে যেন মানুষ সম্মান করতে শেখেনি।”

তিনি আরও জানান, “আজও মনে হয় আমি শোক প্রকাশের প্রক্রিয়া শেষ করতে পারিনি। আমার ভেতরে সেই ব্যথা রয়ে গেছে। আমি তুলনামূলকভাবে এখন সুখী, কিন্তু এই সুখ এসেছে গভীর ট্রমার ভেতর দিয়ে যাওয়ার পর। আমি চেষ্টা করছি নতুন করে জীবনকে সাজাতে, কিন্তু অতীতের ছায়া পুরোপুরি মুছে যায়নি।”

রিয়ার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, আদালতের রায়ে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও সামাজিকভাবে যে আঘাত তিনি পেয়েছেন, তার ক্ষত আজও গভীর। তিনি একসময় বলিউডে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু সুশান্তের মৃত্যুর পরপরই সব যেন ওলট-পালট হয়ে যায়। সিনেমায় কাজের সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, বিজ্ঞাপন থেকে তাকে বাদ দেওয়া হয়, এমনকি ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের অনেকেই দূরত্ব তৈরি করেন। সংবাদমাধ্যমের লাগাতার দৃষ্টি, সোশ্যাল মিডিয়ার ঘৃণা ও হুমকি— সবকিছু মিলিয়ে এক ভয়ঙ্কর সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাকে।

এখন ধীরে ধীরে আবারও তিনি নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু জনকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত হয়েছেন রিয়া। নারী অধিকারের বিষয়ে কথা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নিচ্ছেন। অনেকেই মনে করেন, তার এই নতুন পথচলা শুধু নিজের জীবনের পুনর্গঠনের জন্য নয়, বরং সেই সব নারীর পক্ষেও কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারে যারা অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত হয়ে সমাজচ্যুত হন।

রিয়া চক্রবর্তী নিজেও স্বীকার করেছেন, এই চার বছরে তিনি উপলব্ধি করেছেন— শক্ত হওয়া ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। তিনি বলেন, “আমি ভেঙে পড়তে পারতাম, কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কারণ আমি জানতাম, একদিন সত্য প্রকাশ পাবে।”

ভারতের বিনোদন জগতে রিয়ার এই অভিজ্ঞতা এখন আলোচনার বড় একটি বিষয়। অনেকেই মনে করছেন, মিডিয়ার অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ ও বিচারহীনতা তাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুশান্তের মৃত্যুর তদন্ত ছিল একটি ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন, যা আদালতের রায়ে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া চলাকালীন মিডিয়া ট্রায়াল রিয়ার জীবনকে প্রায় অচল করে দেয়।

আজ চার বছর পর যখন তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন, তখনো তাকে সেই সময়ের ক্ষত বহন করতে হচ্ছে। শোক, দুঃখ আর মানসিক ট্রমা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবুও তিনি নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করছেন— ধীরে, ধাপে ধাপে, প্রতিটি পদক্ষেপে অতীতের ছায়া পেরিয়ে।

সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যু যেমন ভক্তদের জন্য এখনো এক গভীর শোকের বিষয়, তেমনি রিয়া চক্রবর্তীর জীবনেরও এক অমোচনীয় দাগ হয়ে রয়ে গেছে। সেই দাগ হয়তো কখনো পুরোপুরি মুছে যাবে না। তবে তিনি এখন নতুন অধ্যায়ের খোঁজে। আর এই নতুন অধ্যায়ে তিনি চান নিজের শোককে ব্যক্তিগত রাখার অধিকার, নিজের জীবনের পথচলাকে নতুনভাবে সাজানোর স্বাধীনতা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com