কুমিল্লা মহানগর, জেলা ও মেডিকেল কলেজে ড্যাবের কার্যক্রম স্থগিত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৫৯ বার

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

কুমিল্লা অঞ্চলে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা—কুমিল্লা মহানগর, কুমিল্লা জেলা ও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ শাখার সব কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং অসাংগঠনিক কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগে কেন্দ্রীয় ড্যাব এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাতে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটির মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়।

ড্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও অসাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের কারণে তিন শাখার বর্তমান কার্যক্রম স্থগিত করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত শেষে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে কুমিল্লার চিকিৎসক মহলে ইতোমধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এর আগে ২১ সেপ্টেম্বর রোববার কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ কনফারেন্স রুমে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অংশ নেয় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ শাখার ড্যাব ও জাতীয়তাবাদী চিকিৎসক কর্মকর্তা কর্মচারীবৃন্দ। তারা অভিযোগ করেন, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি চলছে। বক্তারা জানান, মেডিকেল কলেজে সরঞ্জাম ও অন্যান্য ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নেই, ফলে এক ধরনের দুর্নীতি ও প্রভাব বিস্তারের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্প-এর্দোগান বৈঠক: ২৫ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে

সভায় বক্তারা স্পষ্টভাবে বলেন, ড্যাব একটি জাতীয়তাবাদী চিকিৎসক সংগঠন এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা মেনে তারা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বদ্ধপরিকর। তাদের দাবি, ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা চাঁদাবাজি চলতে দেওয়া হবে না এবং নিয়ম মেনে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। বক্তারা আরও বলেন, ড্যাবের কোনো সদস্য যদি অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে, তবে কেন্দ্রীয় কমিটি যথাযথ ব্যবস্থা নেবে এবং দুর্নীতিবাজদের কোনো আশ্রয় দেওয়া হবে না।

প্রতিবাদ সভার পরদিনই কেন্দ্রীয় ড্যাবের এমন কঠোর সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সংগঠনের কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছেন, স্থানীয় পর্যায়ে কিছু নেতা অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারে জড়িয়ে পড়ায় সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এ কারণে দায়ীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আগে তিন শাখার কার্যক্রম স্থগিত করে তদন্ত কমিটি গঠন করা জরুরি হয়ে পড়ে।

স্থানীয়ভাবে অভিযোগ উঠেছে, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের পরিচালক ডা. মাসুদ পারভেজ এবং ড্যাবের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা টেন্ডার প্রক্রিয়া ও বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন। এ নিয়ে চিকিৎসক মহলে দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনেকেই মনে করেন, ড্যাবের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও প্রভাব বিস্তারের কারণে সাধারণ চিকিৎসক সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা চিকিৎসা সেবার মানের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

ড্যাব মূলত জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী চিকিৎসকদের একটি সংগঠন, যার জন্মই হয়েছিল রাজনৈতিক ও পেশাগত অধিকার রক্ষার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। সংগঠনটির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এবং এটি বাংলাদেশের চিকিৎসা অঙ্গনে একটি প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ড্যাবের একাংশের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠায় সংগঠনের ভাবমূর্তিতে চিড় ধরেছে। অনেকেই মনে করছেন, কুমিল্লা অঞ্চলে সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত সেই সংকট মোকাবিলার একটি প্রচেষ্টা।

বিশ্লেষকদের মতে, ড্যাব কেবল একটি চিকিৎসক সংগঠনই নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে এর প্রভাব রয়েছে। তাই এর শাখাগুলির ওপর কেন্দ্রীয় কমিটির এ ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্য বহন করে। এতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব একদিকে যেমন বার্তা দিচ্ছে যে অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না, অন্যদিকে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিয়ন্ত্রণেও উদ্যোগী হচ্ছে।

চিকিৎসক সমাজের অনেকে মনে করেন, এ সিদ্ধান্ত সংগঠনকে শুদ্ধ করার একটি সুযোগ এনে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকদের একটি অংশ অভিযোগ করে আসছিলেন যে, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন স্থানে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তিস্বার্থসিদ্ধি করা হচ্ছে। এখন কার্যক্রম স্থগিত হওয়ায় এবং তদন্ত শুরু হওয়ায় সেই অভিযোগ যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে সংগঠনের একটি অংশ এ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তাদের দাবি, সব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং কিছু মহল সংগঠনকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্র করছে। তারা মনে করেন, কুমিল্লার চিকিৎসকদের আন্দোলন ছিল অনিয়মের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ, অথচ সেটিকে অজুহাত বানিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি পুরো তিনটি শাখার কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে।

এ নিয়ে কুমিল্লার সাধারণ মানুষের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। অনেকেই মনে করেন, স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি-অনিয়ম দূর করতে হলে প্রথমে চিকিৎসক সমাজের ভেতর থেকে শুদ্ধি অভিযান চালানো জরুরি। আবার কেউ কেউ বলছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ যদি স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে না হয় তবে তা কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে নেওয়া হয়েছে বলে সন্দেহ তৈরি করবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ ঘটনার ওপর নজর রাখছে বলে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা খাত যেহেতু সরাসরি মানুষের জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই এ খাতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি সমাজে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

অবশেষে বলা যায়, কুমিল্লা মহানগর, জেলা ও মেডিকেল কলেজ শাখায় ড্যাবের কার্যক্রম স্থগিত করার ঘটনাটি কেবল একটি সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নয়, বরং চিকিৎসা খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এখন অপেক্ষা—তদন্ত কমিটি কীভাবে কাজ করে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কী ধরনের সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। জনগণ ও চিকিৎসক সমাজ উভয়ই আশা করছেন, এ পদক্ষেপের মাধ্যমে ড্যাবের ভেতরকার অনিয়মের অবসান ঘটবে এবং চিকিৎসা সেবায় ফিরবে স্বচ্ছতা ও আস্থা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত