প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
আগামী জাতীয় নির্বাচন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ পরিচালনার লক্ষ্যে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) নতুন প্রকল্প প্রস্তাব করেছে, যার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬৫ কোটি টাকা। নির্বাচনের প্রস্তুতি জোরদার করতে এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদসহ ভোটের অবকাঠামো আধুনিকায়ন করতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ইসি মনে করছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের সম্ভাব্য জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রকল্পের কাজ শুরু হলে নির্বাচন প্রক্রিয়ার দৃঢ়তা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে।
ইসি জানায়, এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো উপজেলাভিত্তিক, জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সার্ভার স্টেশন এবং নির্বাচন অফিস নির্মাণের মাধ্যমে ভোটার তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা। পাশাপাশি জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো যেমন ব্যালট পেপার, ভোটার নিবন্ধন ফরম, ব্যালট বাক্স, ইভিএম মেশিন ও অন্যান্য নির্বাচনি যন্ত্রপাতি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে মাঠ পর্যায়ে নাগরিক সেবা সহজ হবে এবং নির্বাচনী কার্যক্রমের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে।
ইসি কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, পূর্ববর্তী প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের বেশিরভাগ উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সার্ভার স্টেশন নির্মাণ করা হলেও জমি বরাদ্দ জটিলতা এবং নতুন উপজেলার কারণে ৬৬টি সার্ভার স্টেশন নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে অনেক এলাকায় এখনও ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও ডেটাবেস সংরক্ষণ কার্যক্রম পুরনো বা অস্থায়ী ভবনের ওপর নির্ভর করছে। নতুন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এই ঘাটতি দূর হবে এবং সার্ভিসের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে।
উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) বলা হয়েছে, প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে এটি বাস্তবায়ন করা হবে চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্পের আওতায় একটি আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস, তিনটি জেলা নির্বাচন অফিস ভবন, ৪৬টি উপজেলা নির্বাচন অফিস ও সার্ভার স্টেশন এবং ১৬টি মেট্রোপলিটন থানার জন্য অফিস স্পেস নির্মাণ করা হবে।
প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থ ব্যয় হবে ১৬টি থানা নির্বাচন কার্যালয় ও সার্ভার স্টেশন নির্মাণে, যা মোট ব্যয়ের ৫১ শতাংশের বেশি। প্রতিটি কার্যালয়ের আয়তন হবে এক হাজার ৬০০ বর্গফুট করে মোট ৮০ হাজার বর্গফুট। এছাড়া উপজেলা নির্বাচন অফিস ও ৪৪টি সার্ভার স্টেশন নির্মাণের জন্য প্রায় ১৩৬ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে, যা মোট ব্যয়ের ২১ শতাংশের বেশি।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “এটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রত্যেক উপজেলায় আমাদের সার্ভার আছে, যেখানে নেই সেখানে নতুন করে নির্মাণের জন্য প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি নাগরিক সেবা কার্যক্রম আরও ত্বরান্বিত করবে।”
ডিপিপিতে আরও বলা হয়েছে, ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য পূরণের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও ব্যবহার বাড়াতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারি উদ্যোগে স্থাপিত পাঁচ হাজার ৫৫৪টি ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে জনগণ বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণে সক্ষম হচ্ছে। এই অবকাঠামোতে ভোটার তালিকা হালনাগাদ এবং নাগরিক সেবা কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।
ইসি জানায়, যথাযথ নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে নির্ভুল ভোটার তালিকা ও সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচন অপরিহার্য। ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তৎকালীন কমিশন বাংলাদেশ সরকার ও বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার অর্থায়নে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। এটি দেশের প্রথম জাতীয় তথ্যভাণ্ডার তৈরি করে, যা নাগরিক শনাক্তকরণের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে কাজ করছে।
ছবিসহ ভোটার তালিকা ব্যবহারের ফলে ভুয়া ভোটের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এই তথ্যভাণ্ডার বর্তমানে দেশের সকল নির্বাচন এবং নাগরিক সেবা কার্যক্রমে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে এ কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা হবে।
ইসির আরেকটি প্রকল্প ‘কনস্ট্রাকশন অব উপজেলা অ্যান্ড রিজিওনাল সার্ভার স্টেশনস ফর ইলেকট্রোরাল ডেটাবেস’-এর মাধ্যমে দেশের সব উপজেলা, জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সার্ভার স্টেশন ও নির্বাচন অফিস স্থাপন করা হয়েছে। তবে পূর্ববর্তী প্রকল্প চলাকালীন ভূমি বরাদ্দ জটিলতা এবং নতুন উপজেলা গঠনের কারণে ৬৬টি সার্ভার স্টেশন নির্মাণ অসম্পূর্ণ ছিল। বর্তমান প্রকল্পের মাধ্যমে এই ৬৬টি স্টেশনও নির্মাণ করা হবে।
ইসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, সার্ভার স্টেশন না থাকায় অনেক উপজেলা অফিস বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হয়। ভোটার তালিকা হালনাগাদ থেকে শুরু করে জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত কাজগুলোতে দেরি হয়। নতুন ভবন নির্মাণের মাধ্যমে এসব সমস্যা দূর হবে এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।
ইসি কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, অবকাঠামোগত ঘাটতি দূর হলে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম বিকেন্দ্রীভূত হবে। মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলোতে নাগরিক সেবা দ্রুত ও সহজভাবে পৌঁছাবে। এতে ভোটাররা আরও স্বচ্ছ এবং সময়োপযোগী সেবা পাবেন। ভবিষ্যতে এই উদ্যোগ দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য একটি মডেল হিসেবে কাজ করবে।
নির্বাচন কমিশনের এ প্রকল্প প্রমাণ করে যে, শুধু ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়া নয়, বরং ভোটারদের সঠিক তথ্যভাণ্ডার ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করাও ইসির অগ্রাধিকার। এতে ভোটারদের বিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য হবে।