সিলেটের ভূমিকম্প ও করণীয়: প্রশাসন কতটা প্রস্তুত?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৬৪ বার
সিলেটের ভূমিকম্প ও করণীয়: প্রশাসন কতটা প্রস্তুত?

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সিলেট: সিলেট অঞ্চলে আবারও ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হয়েছে। গতকাল রোববার দুপুর ১২টা ১৯ মিনিটে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলাকে কেন্দ্র করে ৪ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। যদিও আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, এতে কোথাও সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবে এই ধরনের কম্পন স্থানীয় জনগণের মধ্যে উদ্বেগ বৃদ্ধি করেছে।

এর আগে ভারতের আসামের উদালগুড়ি জেলায় ৫.৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে, যার প্রভাব সিলেটেও অনুভূত হয়। ভূমিকম্প এবং কম্পনের ঘন ঘন ঘটনা সিলেটবাসীর মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে এবং এলাকাবাসী সচেতনতা বৃদ্ধির দাবি তুলছে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মুশতাক আহমেদ বলেন, “সিলেট কেবল বাইরের ভূমিকম্পের প্রভাবে কম্পিত হচ্ছে না, বরং স্থানীয় ফল্ট লাইনগুলোও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে ডাউকি ফল্ট অনেক দিন ধরেই আমাদের শঙ্কার কারণ। এছাড়া কপিলি ফল্টেও বিপুল শক্তি জমে আছে, যা ভবিষ্যতে ভয়াবহ ভূমিকম্প ডেকে আনতে পারে।”

সিলেটের ভূতাত্ত্বিক গঠন অনুযায়ী, সুরমা বেসিনের নিচে একাধিক সক্রিয় ফল্ট লাইন বিদ্যমান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সিলেট ফল্ট, সুরমা ফল্ট, ডাউকি ফল্ট, আটগ্রাম–ভৈরব লাইনামেন্ট এবং চট্টগ্রাম–ত্রিপুরা ফোল্ড বেল্ট। এই ফল্ট লাইনের যেকোনো একটিতে চাপ জমলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, সিলেট শহর, ছাতক, সুনামগঞ্জ, জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট এবং মৌলভীবাজারের বেশ কয়েকটি অঞ্চল সরাসরি ঝুঁকিতে রয়েছে।

সেপ্টেম্বরের ২০ দিনে এসেছে ১৯০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স

স্থানীয় প্রশাসন এবং নগর পরিকল্পনাকারীদের জন্য এই ভূমিকম্পের পূর্বাভাস এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সিলেট সিটি করপোরেশন ২০১৯ সালে ঝুঁকিপূর্ণ ২৪টি ভবনের তালিকা প্রকাশ করেছিল। এর মধ্যে ১৮টি ভবন এখনও সংস্কার হয়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন ভবনগুলো ভুবিকম্প প্রতিরোধী নকশায় তৈরি হলেও স্থানীয় ফল্ট লাইনের চাপ এবং পুরনো অবকাঠামোর দুর্বলতা সিলেটবাসীর জন্য বড় বিপদ তৈরি করতে পারে।

অধ্যাপক ড. মুশতাক আহমেদ আরও বলেন, “ছোট ছোট কম্পনও ভবিষ্যতে বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হতে পারে। তাই প্রশাসনের তৎপরতা এবং জরুরি প্রস্তুতি গ্রহণ ছাড়া সিলেটবাসীকে নিরাপদ রাখা কঠিন। প্রতিটি ভবনের শক্তি যাচাই, জরুরি সরঞ্জাম প্রস্তুতি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।”

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানা গেছে, ভূমিকম্পজনিত ঝুঁকিতে সিলেটের বিভিন্ন ইউনিয়ন, পৌরসভা ও জেলা প্রশাসন পর্যায়ে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। জরুরি সেবা, হাসপাতাল এবং উদ্ধারকর্মীদের প্রস্তুতি বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয় স্কুল, কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অস্থায়ী জরুরি কর্মসূচি তৈরি করতে বলা হয়েছে।

তবে প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকার কর্মকর্তাদের বক্তব্যে কিছুটা অস্পষ্টতা লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে পুরনো এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের পুনর্বাসন বা সংস্কারের জন্য এখনও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। নগর পরিকল্পনাকারীদের মতে, একাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংস্কার না হলে, ভবিষ্যতে ভূমিকম্পের তীব্র প্রভাব মারাত্মক হতে পারে।

জরিপ এবং পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সিলেটবাসী ভূমিকম্পের প্রভাব থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য সচেতন হচ্ছে। তারা নিরাপদ স্থানে সরানোর প্রক্রিয়া, জরুরি কিট, পানি, খাদ্য এবং চিকিৎসা সেবার প্রস্তুতি নিতে আগ্রহী। এছাড়া, স্থানীয় কমিউনিটি লিডার এবং স্বেচ্ছাসেবক সংস্থাগুলোও সচেতনতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, সিলেট অঞ্চলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমানো শুধুমাত্র নতুন নকশার ভবন নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জরুরি পরিকল্পনা, সতর্কতা সংকেত ব্যবস্থা, উদ্ধারকর্মী প্রস্তুতি এবং সাধারণ জনগণের প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনকে অবশ্যই নিয়মিত ড্রিল, জনসচেতনতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

বেশিরভাগ ভূতাত্ত্বিকরা মনে করেন, সিলেটের সক্রিয় ফল্ট লাইনের ওপর নজর রাখা এবং ভূমিকম্প পূর্বাভাসের প্রযুক্তি ব্যবহার অপরিহার্য। ভবিষ্যতে বড় আকারের ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে এসব প্রযুক্তি ও তথ্য ব্যবহার করে প্রস্তুতি গ্রহণ করা যেতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, প্রশাসনকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলি সংস্কার বা পুনর্বাসনের পাশাপাশি স্থায়ী জরুরি ব্যবস্থার জন্য আরও সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। পাশাপাশি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও জনবহুল স্থানে নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সিলেটের মতো ফল্ট-সক্রিয় অঞ্চলগুলোতে ছোট ভূমিকম্পও বড় বিপদের পূর্বাভাস হতে পারে। তাই জরুরি প্রস্তুতি, জনসচেতনতা এবং অবকাঠামো শক্তিশালী করা এখনই প্রয়োজনীয়।

এদিকে, স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এমন ভূমিকম্পজনিত ঝুঁকির মোকাবিলায় জেলা পর্যায়ে জরুরি পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। উদ্ধার ও চিকিৎসা দলের প্রস্তুতি, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন এবং স্থানীয় জনগণকে সচেতন করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে বাসিন্দারা চাইছেন, এই প্রস্তুতি কার্যকর ও সময়মতো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হোক।

সিলেটের ভূমিকম্প পরিস্থিতি শুধু স্থানীয় নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের ওপরও প্রভাব ফেলছে। বেসরকারি ও সরকারি স্থাপনা, স্কুল কলেজ, হাসপাতাল ও বাজার এলাকা সবগুলোতে প্রস্তুতি না থাকলে ভূমিকম্পের প্রভাব মারাত্মক হতে পারে।

সিলেট অঞ্চলের ভূমিকম্প সচেতনতা বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কার, জরুরি ব্যবস্থা এবং জনগণের প্রস্তুতি নেওয়া এখন সময়োপযোগী। ভূতাত্ত্বিকরা বলছেন, সতর্কতা এবং প্রাথমিক প্রস্তুতি ছাড়া বড় আকারের ভূমিকম্পের প্রভাব প্রতিরোধ করা কঠিন।

এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসন, বিজ্ঞানী এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া সিলেটবাসীকে নিরাপদ রাখা কঠিন হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার পর্যবেক্ষণ, জরুরি সরঞ্জামের প্রস্তুতি, জনগণের প্রশিক্ষণ এবং অবকাঠামোর শক্তিশালীকরণই এখন সিলেটের জন্য প্রধান করণীয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত