প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
চাঁপাইনবাবগঞ্জ: বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে আবারও পুশইনের ঘটনা ঘটেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ১৯ জন বাংলাদেশিকে পুশইন করেছে। বুধবার ভোররাত আনুমানিক ৫টার দিকে ভোলাহাট উপজেলার চামুচা ও চাঁনশিকারী বিওপি’র মধ্যবর্তী সীমান্ত দিয়ে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়। বিজিবি সদস্যরা টহলরত অবস্থায় ওই ১৯ জনকে আটক করে। আটককৃতদের মধ্যে রয়েছেন ১০ জন পুরুষ, ছয়জন নারী এবং তিনজন শিশু।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ১১৯ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের কাঞ্চান্টার ক্যাম্প থেকে তাদের এই সীমান্ত পথে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। এটি চলতি মাসে দ্বিতীয়বারের মতো বড় ধরনের পুশইন। এর আগে একই সীমান্ত দিয়ে দুই দফায় ২১ জন বাংলাদেশিকে পুশইন করেছিল বিএসএফ। ধারাবাহিকভাবে সীমান্তে এ ধরনের ঘটনা ঘটায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
আটকদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তারা ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে অবৈধভাবে কাজের খোঁজে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। বেশিরভাগই দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক বা ছোটখাটো ঝুটপাট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে তারা নির্মাণশ্রমিক, ঘরোয়া কাজ কিংবা কৃষিকাজে নিয়োজিত ছিলেন। তবে অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণে তারা ভারতীয় পুলিশের হাতে ধরা পড়েন এবং বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ভোগ করেন। সাজা শেষে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করে। পরবর্তীতে বিএসএফ তাদের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়াই সীমান্তে এনে বাংলাদেশে প্রবেশ করিয়ে দেয়।
৫৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম কিবরিয়া গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আটক ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তী প্রক্রিয়া অনুযায়ী, তাদের ভোলাহাট থানায় হস্তান্তর করা হবে। তিনি আরও বলেন, পুশইনের এ ধরনের ঘটনা মানবিক এবং কূটনৈতিক দুই দিক থেকেই জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে। বিজিবি বিষয়টি নজরে রেখেছে এবং উচ্চপর্যায়ে এ বিষয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশইন নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রায়শই দেখা যায়, দীর্ঘ মেয়াদে ভারতে কাজ করতে যাওয়া বাংলাদেশিদের গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। কারাভোগ শেষে তাদের নিজ দেশে ফেরানোর কথা থাকলেও অনেক সময় আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় না। বরং বিএসএফ তাদের সীমান্তে এনে ঠেলে দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। এতে মানবিক সংকট তৈরি হয় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনার পরিবেশ নষ্ট হয়।
স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত অনেক মানুষ অর্থনৈতিক দিক থেকে দুর্বল। কর্মসংস্থানের অভাব, দারিদ্র্য ও পরিবার চালানোর দায়ে তারা ভারতে কাজের উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে প্রবেশ করেন। অনেক সময় দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়ে তারা সীমান্ত পেরোনোর ঝুঁকি নেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে বৈধ কাগজপত্র না থাকায় তারা পুলিশ ও প্রশাসনের হাতে গ্রেফতার হন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার বাসিন্দা ও স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা মনে করছেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। দরিদ্র মানুষদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া সীমান্তে এ ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকানো কঠিন হবে। একইসঙ্গে দুই দেশের মধ্যে শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন চুক্তি ও আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা দরকার, যাতে কেউ সাজা ভোগ শেষে মানবিক মর্যাদার সঙ্গে দেশে ফিরতে পারে।
বিজিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনায় রয়েছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি অনেক সময় ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবর্তন চুক্তি থাকা সত্ত্বেও, বিএসএফের সদস্যরা অনেক সময় সেই প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে সরাসরি পুশইন করে থাকেন। এর ফলে সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয় এবং মানবিক সঙ্কটও ঘনীভূত হয়।
আটক ব্যক্তিদের একজন সাংবাদিকদের জানান, তিনি কয়েক বছর আগে ভারতের আসাম রাজ্যে কৃষিকাজ করতে গিয়েছিলেন। সেখানেই ধরা পড়ে কারাদণ্ড ভোগ করেন। সাজা শেষে স্থানীয় পুলিশ বিএসএফের হাতে তুলে দেয়। কিন্তু তাকে বৈধ পথে দেশে পাঠানো হয়নি। বরং রাতের অন্ধকারে সীমান্তে এনে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা ভুল করেছি, কিন্তু এত কষ্টে পরিবার ছেড়ে বাইরে কাজ করতে গিয়েছিলাম। এখন দেশে ফিরেও নিশ্চিত নই ভবিষ্যৎ কী হবে।”
মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ ধরনের পুশইন কার্যক্রমের নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলছে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে জোরপূর্বক সীমান্তে পাঠানো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের শামিল। তাদের মতে, প্রতিটি নাগরিকের নিজ দেশে ফেরার অধিকার রয়েছে, তবে তা অবশ্যই সুষ্ঠু আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে হবে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও মনে করছেন, এই ধরনের পুশইন কার্যক্রম সীমান্তে মানবিক সংকট বাড়াচ্ছে। শিশু ও নারীদের জড়িয়ে পড়া পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। সীমান্ত দিয়ে যেসব মানুষ ফিরছে, তাদের অধিকাংশই কর্মসংস্থানের অভাবে চরম হতাশা থেকে অবৈধভাবে বাইরে গিয়েছিল। এখন দেশে ফিরে তারা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।
বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে বিষয়টি কূটনৈতিকভাবে ভারতের সামনে উত্থাপন করেছে। তবে বারবার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও পুশইনের ঘটনা বন্ধ হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা, দালাল চক্রের সক্রিয়তা এবং দারিদ্র্য—এই তিনটি বিষয় সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করছে।
স্থানীয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, আটক হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান হবে কেবল তখনই, যখন বাংলাদেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা যাবে।
সীমান্তে পুশইনের ঘটনাগুলো কেবল মানবিক নয়, কূটনৈতিক ইস্যুতেও পরিণত হয়েছে। কারণ, দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং সীমান্তে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এ ধরনের ঘটনা এড়ানো অত্যন্ত জরুরি। না হলে সীমান্ত অঞ্চলে বসবাসরত মানুষদের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে।
উপসংহারে বলা যায়, ভোলাহাট সীমান্তে বিএসএফের মাধ্যমে ১৯ বাংলাদেশিকে পুশইন আবারও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও মানবিক নিরাপত্তা প্রশ্নে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। কর্মসংস্থানের অভাব, দারিদ্র্য ও অবৈধ পথে কাজের খোঁজে যাওয়া মানুষদের এই সমস্যার মূল কারণ। এ জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগ, কার্যকর চুক্তি বাস্তবায়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিই হতে পারে স্থায়ী সমাধানের পথ।