প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ডেনমার্কের আকাশসীমায় রহস্যজনক ড্রোন কার্যকলাপ দেখা দেওয়ায় দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলবর্গ বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যিক ও সামরিক উভয় উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত এ বিমানবন্দর হঠাৎ করে অজ্ঞাত পরিচয়ের একাধিক ড্রোনের উপস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। দেশটির পুলিশ ও বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ড্রোনগুলো বুধবার স্থানীয় সময় রাত ৯টা ৪৪ মিনিটের দিকে আকাশে দেখা যায় এবং কয়েক ঘণ্টা ধরে টহল দিতে থাকে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, ড্রোনগুলোতে আলো জ্বলছিল এবং সেগুলো নিয়মিতভাবে আকাশে ঘোরাফেরা করছিল। তবে এগুলো কারা নিয়ন্ত্রণ করছিল বা এর উদ্দেশ্য কী, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। আলবর্গ বিমানবন্দর থেকে অন্তত তিনটি ফ্লাইটের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে, যাতে যাত্রীদের ঝুঁকি এড়ানো যায়। যদিও বিমানবন্দর বা আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো নিরাপত্তা হুমকি নেই বলে আশ্বস্ত করেছে কর্তৃপক্ষ। তবুও সাধারণ মানুষকে এলাকা থেকে দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ডেনিশ পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ড্রোন উড়ানোর পেছনে কারা রয়েছে বা তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। “আমরা এখনো নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছি না,” এক পুলিশ মুখপাত্র বলেন। “তবে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্তাধীন রয়েছে।”
আলবর্গ ছাড়াও ডেনমার্কের দক্ষিণাঞ্চলের আরও তিনটি ছোট বিমানবন্দর—এসবজের্গ, সোন্ডারবর্গ এবং স্ক্রিডস্ট্রুপেও একই ধরনের ড্রোন কার্যকলাপের খবর পাওয়া গেছে। যদিও সেসব বিমানবন্দর বন্ধ করা হয়নি, তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং কোনো প্রকার আতঙ্কে না পড়ার জন্য জনগণকে আহ্বান জানাচ্ছে।
এই ঘটনার আগে সপ্তাহের শুরুতে কোপেনহেগেন বিমানবন্দরও একই কারণে চার ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখতে হয়েছিল। ডেনমার্কের আকাশসীমায় কয়েক দিনের মধ্যে বারবার ড্রোন অনুপ্রবেশের ঘটনা দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপের বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন রহস্যজনক কার্যকলাপকে অনেকে গভীরভাবে দেখছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ডেনমার্ক ইউরোপের একটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ দেশ এবং এর বিমানবন্দরগুলো শুধু যাত্রী পরিবহনের জন্যই নয়, সামরিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে ডেনমার্কের সামরিক ঘাঁটি ও আকাশপথে ড্রোনের উপস্থিতি অজানা কোনো হুমকির ইঙ্গিত হতে পারে। বিশেষ করে স্ক্রিডস্ট্রুপ বিমানবন্দর, যেটি একটি সামরিক ঘাঁটির কাছে অবস্থিত, সেখানে ড্রোন কার্যকলাপের বিষয়টি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
ইউরোপে এর আগেও বেশ কিছু দেশ এ ধরনের ড্রোন কার্যকলাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গত কয়েক বছরে সুইডেন, নরওয়ে ও জার্মানির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাতেও অজ্ঞাত ড্রোন দেখা গেছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এসব ঘটনার পেছনে গোয়েন্দাগিরি কিংবা সাইবার যুদ্ধের অংশ হিসেবে নতুন ধরনের কৌশল থাকতে পারে। আবার অনেকেই মনে করছেন, এটি হয়তো কেবলমাত্র প্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট কোনো শখের কার্যকলাপও হতে পারে। তবে বারবার বিমানবন্দর এলাকায় ড্রোন উড়ানো নিছক কাকতালীয় ঘটনা নয় বলেই মনে করা হচ্ছে।
ডেনিশ কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাইছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশ ও বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, যাতে ড্রোন শনাক্তকরণ ও নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি আরও উন্নত করা যায়। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও ঘটনাটির দিকে নজর রেখেছে। বিশেষ করে সামরিক বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় অজ্ঞাত ড্রোনের উপস্থিতি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হতে পারে বলে তারা মনে করছে।
অন্যদিকে, যাত্রীরা এ ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। আলবর্গ বিমানবন্দরে ফ্লাইট বিলম্ব ও রুট পরিবর্তনের কারণে শত শত যাত্রীকে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। তবে বিমান কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের আশ্বস্ত করেছে যে তাদের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিশ্চিত করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মহলেও ডেনমার্কের ঘটনাটি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপীয় দেশগুলোকে এখন সম্মিলিতভাবে এ ধরনের ঘটনার মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হবে। কারণ একটি দেশের আকাশসীমায় ড্রোন অনুপ্রবেশ অন্য দেশগুলোর নিরাপত্তার সঙ্গেও প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত।
সব মিলিয়ে, ডেনমার্কের আলবর্গ বিমানবন্দর বন্ধ হওয়ার ঘটনা শুধু একটি নিরাপত্তা সতর্কতা নয়, বরং এটি ইউরোপে বেড়ে ওঠা অজানা হুমকির প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে। আগামী দিনে দেশটির তদন্তে এ ড্রোন কারা পাঠিয়েছে এবং কেন পাঠিয়েছে তার সুনির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যাবে বলে আশা করছে ডেনিশ পুলিশ। তবে ততদিন পর্যন্ত বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ সতর্কতায় রাখা হবে।