প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশজুড়ে আজ শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। মহাষষ্ঠীর সকালে ভোর থেকে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের মন্দিরে কাঁসর, ঘণ্টা, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পরিবেশ। বর্ণাঢ্য সাজসজ্জা, পূজা-অর্চনা আর ভক্ত-অনুরাগীদের ঢল যেন জানিয়ে দিলো, শুরু হলো পাঁচ দিনের এ মহাউৎসব, যা শেষ হবে আগামী ২ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে।
শনিবার সন্ধ্যায় শ্রীপঞ্চমীতে দেবীর বোধন বা জাগরণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্গোৎসবের যাত্রা শুরু হয়। এরপর রবিবার মহাষষ্ঠীর সকালে দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাস অনুষ্ঠিত হয় যথাযথ নিয়ম মেনে। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে দেশব্যাপী দুর্গাপূজার কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠান হিসেবে এই বোধন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন হাজারো ভক্ত ও সাধারণ দর্শনার্থী।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন পুরোহিত প্রণব চক্রবর্তী, বরুণ চক্রবর্তী এবং ধর্মদাস মুখোপাধ্যায়। পুরোহিত প্রণব চক্রবর্তী জানান, শাস্ত্রীয় নিয়ম অনুযায়ী ষষ্ঠীতে সূর্যাস্তের পর দেবীর বোধন হয়। শনিবার সকাল ৯টা ১৮ মিনিট পর্যন্ত ছিল পঞ্চমী। এর পর শুরু হয় ষষ্ঠী, যা রবিবার সকাল ১১টা ১২ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তাই শাস্ত্রানুযায়ী শনিবার সন্ধ্যাতেই বোধন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়।
পুরোহিতরা জানান, দেবীর বোধন বিল্ববৃক্ষ তলে সম্পন্ন করা হয়, কারণ বিশ্বাস করা হয় সেখানে দুর্গা কুমারীরূপে অবস্থান করেন। দক্ষিণায়নে দেবী নিদ্রিত থাকেন, তাই তাকে জাগ্রত করার জন্য বিশেষ বন্দনা-পূজা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের প্রাঙ্গণে বেলগাছের নিচে অনুষ্ঠিত এই পূজা ভক্তদের আবেগাপ্লুত করে তোলে।
ষষ্ঠীর সকালে দেবীর আবাহন, সংকল্প এবং পূজার্চনার মাধ্যমে দেবীকে স্বাগত জানানো হয়। আচার অনুসারে এবারের পূজায় দেবী দুর্গা এসেছেন গজে, অর্থাৎ হাতি চড়ে। এর প্রতীকী ব্যাখ্যায় বলা হয়, হাতি চড়ে আগমন শান্তি, সমৃদ্ধি ও শস্য-শ্যামলার প্রতীক। তবে দেবীর প্রস্থান হবে দোলায়, অর্থাৎ পালকি চড়ে, যা শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় মহামারী বা মড়কের ইঙ্গিত বহন করে। এ নিয়ে ভক্তদের মধ্যে একদিকে আনন্দ, অন্যদিকে মিশ্র অনুভূতি কাজ করছে।
রাজধানী ঢাকায় এবার ২৫৯টি মন্দির-মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। গতবারের তুলনায় এ সংখ্যা বেড়েছে ৭টি। সারাদেশে এবারের দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে মোট ৩৩ হাজার ৩৫৫টি মন্দির-মণ্ডপে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় এক হাজার বেশি। পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা বলছেন, মণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে বোঝা যায় মানুষ এখনো ঐতিহ্য ও ধর্মীয় উৎসবে ভরপুরভাবে অংশ নিতে চায়।
ঢাকেশ্বরী মন্দির ছাড়াও রাজধানীর রামকৃষ্ণ মিশন, বনানী পূজা মণ্ডপ, সিদ্ধেশ্বরী মন্দির, রমনা কালী মন্দির এবং অন্যান্য মণ্ডপেও সকাল থেকে শুরু হয়েছে মহাষষ্ঠীর আনুষ্ঠানিকতা। ভক্তরা ভোর থেকেই সারিবদ্ধ হয়ে প্রবেশ করেছেন এসব মন্দিরে। অনেকেই পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করেছেন দেবীর চরণে। পরিবেশ ছিল ভক্তিমূলক গীতি ও মন্ত্রোচ্চারণে মুখরিত।
এবারের দুর্গোৎসবকে ঘিরে রাজধানীসহ সারাদেশেই ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে প্রশাসন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছেন, প্রতিটি মণ্ডপেই সিসি ক্যামেরা, আর্চওয়ে ও পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ভক্ত-দর্শনার্থীর ভিড় সামাল দিতে অতিরিক্ত আনসার ও পুলিশ সদস্য নিয়োজিত আছেন।
উৎসবকে ঘিরে মণ্ডপগুলোতে সাজসজ্জার প্রতিযোগিতাও চলছে। কোথাও ঐতিহ্যবাহী ধাঁচে প্রতিমা সাজানো হয়েছে, আবার কোথাও আধুনিক শিল্পরীতির ছোঁয়ায় তৈরি করা হয়েছে দুর্গা প্রতিমা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যেই ভাইরাল হচ্ছে এসব শিল্পকর্মের ছবি ও ভিডিও।
মহাষষ্ঠীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামীকাল সোমবার মহাসপ্তমী পূজা অনুষ্ঠিত হবে। সপ্তমীর সকালে কলাবউ স্নান ও নবপত্রিকা প্রবেশের মধ্য দিয়ে শুরু হবে পূজার মূল পর্ব। এরপর মহাঅষ্টমী, মহানবমী এবং সর্বশেষ বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটবে এ মহাউৎসবের।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পূজা মণ্ডপগুলো এখন উৎসবের রঙে রাঙানো। চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, রংপুর, সিলেটসহ প্রতিটি বিভাগীয় শহরে পূজার আনন্দে ভাসছে মানুষ। গ্রামাঞ্চলেও একই আবহ বিরাজ করছে। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন নিয়ে সবাই জড়ো হচ্ছেন পূজা মণ্ডপে। শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এ উৎসব এখন সার্বজনীন সামাজিক মিলনমেলায় রূপ নিয়েছে। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—সব ধর্মাবলম্বীর মানুষই অংশ নিচ্ছেন দুর্গোৎসবের আনন্দে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দুর্গাপূজা শুধু দেবীর আরাধনা নয়, বরং সামাজিক ঐক্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করারও প্রতীক। তাই প্রতি বছর দুর্গাপূজা ঘিরে যে আনন্দমুখর পরিবেশ তৈরি হয়, তা বাংলাদেশের বহুসংস্কৃতির এক অসাধারণ নিদর্শন।
অতএব, মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই দুর্গোৎসব শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সামাজিক সমন্বয়েরও এক মহামিলন ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভক্তদের বিশ্বাস, দেবী দুর্গার আগমন শান্তি, সমৃদ্ধি ও অকল্যাণ থেকে মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। আর সেই বিশ্বাসকে ঘিরেই সারাদেশে এখন বইছে উৎসবের বর্ণিল হাওয়া।